September 30, 2012

ঝটিকা সফর - ৪


সোমবার থেকে পুরোদস্তুর অফিস সুরু, তার আগে চট করে Select Stores যাব। গড়িয়াহাটার মোড়, মিনিমিনি বাসবাস, সঙ্গে ল্যাংবোট চিঙ্কি। সিমুর বিয়ে, কাঁথাস্টিচের শাড়ি কেনার প্ল্যান ময়ূরকণ্ঠী রঙের।
দোকানে গিয়ে  যদিও এই 'স্পেক' দিয়ে বলেছি শাড়ি দেখান, কোন এক অজ্ঞাত কারণে যে শাড়িগুলো দেখানো হতে লাগলো, সেগুলো না কাঁথাস্টিচ, না ময়ূরকণ্ঠী। সঙ্গে ম্যাজিশিয়ানের প্যাটার - "এইটা দেখুন, অনবদ্য কালার, অসাধারণ কাজ, এই এক পিসই পড়ে আছে"...অথবা  "এটা এই পুজোয় লেটেস্ট ফ্যাশন, কন্ট্রাস্ট দেখেছেন?" এর মধ্যে চা এসে গেছে এক রাউন্ড "আরেক কাপ চা দি, দিদিভাই?"

আমরা বৃথা তর্ক না করে বসে বসে গোটা পনেরো বিভিন্ন রং-রকম-দামের শাড়ি দেখে, একটাও পছন্দ না করে উঠি উঠি করছি "চল ওদিকটা যাই, ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি..." শাড়িকাকু মিনতি করলেন "দিদিভাই, এক মিনিট, আরেকটা জিনিস দেখে যান।" তারপর গলা খাদে করে রহস্যময় ভাবে ডাকাডাকি করলেন "মদনা - ভেতর থেকে ওই মালটা বার কর তো, যেটা পেশাল অর্ডারি" আবার পাঁচটা শাড়ি এসে পড়ল, এগুলো সুন্দর দেখতে কিন্তু একটাও কাঁথাকাজের না। যাই হোক, ধৈর্য শেষ, খিদে পেয়েছে, বাজখাঁই নামের বেশ জমকালো শাড়ি কিনে বাড়িমুখো হলাম।

এসে দেখি মা ওষুধের প্যাঁটরা খুলে বসেছে। এই প্যাঁটরাটা আমার, প্রতিবার রিফিল করা হয়, চেনা ওষুধ সঙ্গে থাকলে মনে বল পাই। মা এক একটা পাতা দেখছে আর আঁতকে আঁতকে উঠছে -
(মা) এমা, এটা তো ডেট এক্সপায়ার করে গেছে, ছিঃ ছিঃ এত্তগুলো ক্রোসিন... এহহে, র‍্যানট্যাকগুলো গলে গেছে তো..আচ্ছা আগেরবার যে ব্যাকট্রিম দিলাম, সেগুলো খাস নি?
(আমি) কি আশ্চর্য মা, দরকার না হলে খাব কেন? আমি অত ওষুধ খাওয়া পছন্দ করি না, গাদা গাদা অ্যান্টি বায়োটিক খেয়ে সব রেসিস্টেন্ট...
(মা) রেখে গেলেই পারতিস, আমরা খেয়ে নিতাম।
(আমি) খেয়ে নিতে? এটা আচার না মশলা যে অকারণে খেয়ে নিতে?
(মা) আহ আমি না খেলেও, এই ধর ববিতার কদিন আগে পেট খারাপ হল, তারপর চন্দ্রদীপের গ্যাস্ট্রাইটিস...(ববিতা গলি-সিঁড়ি-ছাদ ঝাঁট দেয়, চন্দ্রদীপ হোল ধোপা)

বাকরুদ্ধ হয়ে চান করতে গেলাম।

বর্ষার দুপুর - লুচি আলুরদম চাটনি খেয়ে, পিঙ্গুকে পান খাইয়ে, ল্যাপটপ বার করে ইমেল দেখব। তখনি কবি কাঁদলেন, অর্থাৎ ক্রোম বলল কানেকশান নেই। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। নতুন কাজ, বসকে বলে এসেছি কোওনো ব্যাপাআআর না, কলকাতা থেকে হইহই করে আপিস করতে পারব...এতো মহা গেরো! বিমর্ষ হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি - ওমা, দেখি আউটলুকে বানের জলের মতো ইমেল আসছে! ইদিকে কোনো ওয়েবপেজ খুলছে না - যাকগে যাক, জয় বাবা ফেলুনাথ, এযাত্রা চাকরিটা বজায় রইল। নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে গেলাম - যাকে বলে ন্যাপ - আবার ৬টার মধ্যে উঠে পড়তে হবে।

বেখাপ্পা সময় কাজ - সন্ধ্যে ৭টা থেকে রাত্তির ৩টে। কিন্তু ঘনঘন কমিক-রিলিফ-ব্রেক, মিটিঙের ফাঁকে দরজা দিয়ে পিঙ্গুর উঁকি, মায়ের মাইম করে জিজ্ঞেস করা কতক্ষণ পরে খেতে বসতে পারব - এসব যখন দাঁড়িপাল্লার এদিকে বসাই, সময়ের বিদঘুটেপন তুশ্চু হয়ে যায়। আর, "কাঠে টোকা দিয়ে" আমার নতুন বসটা একটু পাগলী হলেও মানুষ ভাল, এই সপ্তাহে খটোমটো কিছু শিডিউল করেনি।

শুরু হল সোমবারের মিটিং টিটিং। 


September 27, 2012

ঝটিকা সফর - ৩


আমি আবার একটু hypochondriac আছি, যেটাকে মা বলে ভ্যানতাড়া আর প্রদীপ্ত বলে Munchausen Syndrome। রোববার সকালে যেন শুনলাম মশার পিনপিন শব্দ, তিড়িং করে ঘুম পালিয়ে গেল। খবর কাগজ চা বিস্কুট টেবিলে গুছিয়ে পা গুটিয়ে বসলাম, কিন্তু পায়ে কুটকুট করছিল।

মা গম্ভীরসে বলল "আমাদের বাড়ির মশায় ডেঙ্গু হয় না, ওরা আমগাছের মশা"। তারপর স্বপক্ষসমর্থনে শম্পা, সুনীতা, সুমিত্রাদি সবাইকে সাক্ষী দেয়ালো "বল? তোদের মশা কামড়েছে কিনা? (মস্তকহেলন) ডেঙ্গু হয়েছে? কিছু হয়েছে? (মস্তকদোলন) ব্যাস কিছু হয় নি পায়ে, আর ধুনোর গন্ধে আমাদের asthma হয়"। তাও সিট্রোনেলা মোমবাতি জালিয়ে টেবিলের তলায় স্থাপন করলাম, পিঙ্গুর নাক বাঁচিয়ে।

খেলার পাতাটা পড়ছি, মামী এসে পড়ল "টুলুদি আমায় একটু চা পাতা দাও, দুধটাও জ্বলে গেছে" (মামী রেগুলার গ্যাসে দুধের কড়া বসিয়ে ব্যাঙ্কে যায়)
মামীকে বললাম "দেখেছ পোনোবদা এসেছে কলকাতায়, সবুজ কার্পেট পেতে দিদি ওয়েলকাম করেছে।"
মামী অবাক হয়ে বলল "সেকি, খরাজ আজকাল এখানে থাকে না?"
তারপর আমার ?? মুখ দেখে বলল " ভূতের ভবিষ্যৎ এর প্রমোদ প্রধানের কথা বলছিস তো? ওটা খরাজ ছিল, পল্টনের বন্ধু খরাজ রে।"
আমি মিহি করে বললাম "পোনোবদা মানে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখোপাধ্যায় মামী।"
"ও, দেখেছিস, মাথাটাই গেছে "

এই ফাঁকে বনিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোকে মশা কামড়েছে? অম্লানবদনে উত্তর এলো - হ্যাঁ, রোজ কামড়াচ্ছে, তোর ব্লাডগ্রুপটা জানিয়ে রাখ। শুনেটুনে চারদিকে RAID স্প্রে করলাম। মহা ঝঞ্ঝাট তো!

চিন্তিত ভাবে Mocambo পৌঁছলাম, সেখানে অভিষেক সপ্তদ্বীপা এলিনা দেবজ্যোতি ঋষিরাজ দীপাঞ্জনের সাথে লাঞ্চাড্ডা। একজন ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করা হল মশা তাড়ানো কয়েল আছে কিনা, তারপর ভাগ্যিস পা গুটিয়ে বসেছিলাম, কারণ কাদের কাদের যেন কামড়াল। এদিকে অভিষেক "ঘৃণা লজ্জা ভয় তিন থাকতে নয়" পলিসিতে এদিক ওদিক টেবিলের দিকে আঙুল দেখিয়ে ওয়েটারদের জিজ্ঞেস করছে "আচ্ছা ওরা কি খাচ্ছে? ওটা কি বলুন তো? ওই ওরা যেটা খাচ্ছে, সেটা দু প্লেট দেবেন। দাঁড়ান দাঁড়ান, এটা কি নিয়ে যাচ্ছেন, বেশ দেখতে - এটাও দু প্লেট দেবেন।" 

এর মধ্যে সামনের টেবিলে তিনজন এসে বসলেন, ভদ্রলোকের বয়েস হবে ষাটের কোঠায়, এক মহিলা পঞ্চাশের আশেপাশে, অন্য মেয়েটি হয়তো ত্রিশ। অত্যন্ত অবান্তর গেসিং গেম শুরু হোল - আচ্ছা উনি কি পাত্রী দেখতে এসেছেন? কোনজন পাত্রী? নাকি অনলাইন আলাপ, আজ প্রথম দেখা, গার্ড দেওয়ার জন্যে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন? নাকি বিছড়া হুয়া পুরনো প্রেম? মুখের অভিব্যাক্তি দেখছিস? এটা পুরনো আলাপ হতেই পারে না.. আমরা খুব ইনভল্ভড হয়ে পড়লাম। গলার আওয়াজ কারুরই কম না, পাশের টেবিলের ছেলেটা আমাদের কথোপকথনে উসখুস করছিল, হঠাৎ সপ্তদ্বীপা তার পায়ের কাছে গড় হয়ে "ব্যাগটা পড়ে গেছে দেখি একটু" বলায় বেজায় খচে গেল। 

এত কিছুর পরেও আমরা লোকলজ্জা ত্যাগ করে নানা উপাদেয় খাদ্যাদি সাঁটিয়ে প্রভূত আড্ডা মেরে বাড়িমুখো হলাম। চকোলেট দেবজ্যোতি আর ঋষিরাজ ভাগ করে নিল, ৮০-৪০ ওজন অনুপাতে।

সন্ধ্যেকাল। বেকবাগানে কাকিমার জন্মদিনের নেমন্তন্ন। সেজেগুজে পৌঁছে গেছি, কাবাব খেতে খেতে কাকিমা ঋতশ্রী মামী মা বনি সবাইকে আমার বুটক্যাম্পের গল্প শোনাচ্ছি - এই করতে হয়, ওই করতে হয়, পুশআপ, স্কিপিং, "দেখেছ আমার কি মাসল হয়েছে হাতে?" (বনি পাঞ্জা লড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল...মাথা খারাপ নাকি, তারপর ভাঙা হাত নিয়ে ফিরতে হবে) এই সব কথা হচ্ছে আর সব্বাই অকারণে হাসছি। মামীও খুব হেসে বলল " হ্যাঁ, ঠিক মেরী ডট কমের মত "।

ইফ কম ইজ হিয়ার, ক্যান ডট বি ফার বিহাইন্ড?

দারুণ দারুণ সব রান্না হয়েছিল, খেয়ে দেয়ে বাড়ি এসে ভাইকিংকে ফোনে বিস্তারিত বিবরণ শোনালাম। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল " যা তোরাই তাহলে আনন্দ কর "

আর ও ব্যাটা যে পুজোর কলকাতায় এসে আনন্দ করবে? তার বেলা?

ঝটিকা সফর - ২


পরের দিন সক্কালবেলা পিঙ্গু বিস্কুট নিয়ে এসে ডাকাডাকি করতে লাগলো, ও খাবে আর আমাদের দেখতে হবে। সেই দেখে আমার বিস্কুটখিদে পেল। চা - bourbon cream খেয়ে  শাবানার কাছে যাব - হেনা লাগিয়ে দেবে, মুখে গুঁড়ো গুঁড়ো কীসব লাগিয়ে মেজে দেবে ইত্যাদি - এর মধ্যে কাকিমার বার্তা, আমার জন্যে "এই একটু" গলদা চিংড়ির মালাইকারি আর নকুড়ের মিষ্টি পাঠাচ্ছেন :) তারপর কাল সন্ধেবেলা নেমন্তন্ন, দুপুরে Mocambo তে ক্যুইজ-বন্ধুদের সাথে খাওয়া দাওয়া - খুব প্যাকড প্রোগ্রাম।

মা সখেদে আপত্তি করছে - এই শুরু হোল টো টো করা - বাড়ি এসে একটু রেস্ট করবি তা নয়...(আমি) মা, আমি মায়ামিতে সারাদিন রেস্ট করি, এখানে এসে একটু ঘুরতেও দেবে না? তুমি কি চাও না আমি আনন্দ করি? (মা) যা ইচ্ছে কর আমি আর কিছু বলছি, দুপুরে কি খাবি? (আমি) আবার খাওয়া? ওফফ যা আছে তাই খাব, যা নেই তা কি করে খাব? (বনি) তোমরা প্লিজ বাইরে গিয়ে ঝগড়া করবে? আমি একটু ঘুমোচ্ছি।

এর মধ্যে Emirates ফোন করে প্রভূত ক্ষমা চেয়ে জানাল সুটকেস বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে। ডিলা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস বলতে বলতে হেনারঞ্জিত মাথা নিয়ে বাড়ি এলাম, দুঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলতে হবে। পিঙ্গু এসে ব্যাপারটা দেখেশুঁকে, এক রাউন্ড হেঁচে নিল। মালাইকারি এসে গেছে - অতি সামান্য, ১৫টি ইয়া সাইজের চিংড়ি। সঙ্গে অনবদ্য মাছের কাবাব আর মিষ্টি। খেয়ে, মাথা ধুয়ে, একটু আনন্দবাজারটা নিয়ে একটু গড়িয়ে নেব প্ল্যান, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। বৃষ্টি পড়ছে, ঘরের মধ্যে ঝিমঝিমে অন্ধকার, দিবানিদ্রার আর দোষ কি!

রাত্তিরে তানিয়া, সৌম্যদাদা সব এসে হাজির। আড্ডা মেরে পিঙ্গুর নাচ দেখে সুটকেস ব্যাগপত্র গুছোতে গেলাম। আমার আবার ভয়ানক geometric insecurity আছে, চারপাশটা ঠিকঠাক রাইটঅ্যাঙ্গেল প্যারালাল সেন্টার না হলে মাথায় কটকট করে। সুটকেসটা সোজা করে রেখে, পাশে সার সার করে হ্যান্ডলাগেজ, ল্যাপটপ ব্যাগ সব রেখেছিলাম। এখন দেখি সব ঘেঁটে গেছে। গজগজ করছি আর টেনে টেনে সমান করছি :
(আমি) মা সুমিত্রাদি কে বলবে জিনিস যেরম ছিল সেরম করে রাখতে সব হিজিবিজি করে দিয়েছে 
(মা) তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে? এই বৃষ্টির মধ্যে সুমিত্রা যে আসছে সেটাই অনেক, চারদিকে জ্বরজারি কত হচ্ছে জানিস? 
(আমি) তা এসে যখন পড়ছে, সোজা করে রাখলেই পারে 
(মা) আমি পারব না বলতে, একটা কাজের লোক পাওয়া যায় না তার মধ্যে সোজা উল্টো 
(আমি) ঠিক আছে, এই ঘর মুছতে হবে না কদিন থাক 
(মা) তারপর মশা দেখলে চিল চিৎকার করিস না যেন 
(আমি) ইয়ে...মশা? 
(মা) হ্যাঁ। কোন জগতে থাকিস? ডেঙ্গু হচ্ছে এখানে পড়িস নি? 
(আমি)ও বাবা, মুছুক তাহলে - ফিনাইল দিয়ে যেন মোছে আর ধুনো আছে নাকি, মা? 
(মা) ধুনো দরকার নেই, বাড়াবাড়ি কোরো না।

মশাতঙ্কে ঘুমোতে গেলাম, ওডোমস মেখে।

ঝটিকা সফর - ১


সাত দিনের জন্যে কলকাতা ঘুরে এলাম। মাথার মধ্যে প্ল্যানটা ঘুরপাক খাচ্ছিল কদিন ধরে, তারপর টিকিট করে প্রদীপ্তকে casually বললাম আমি কলকাতা যাচ্ছি (যেমন মাঝে মধ্যেই অস্টিন যাই, এমন একটা ভাব)। শুনে বিমর্ষ হয়ে ফুচকা খেতে মানা করল, কিন্তু কবে যাচ্ছি কবে ফিরছি সেসব আর জিজ্ঞেস করল না। আমিই ফড়ফড় করে বললাম এই দিন airport পৌঁছতে হবে এই দিন আনতে হবে ইত্যাদি। মা কে সারপ্রাইজ দেব, এই প্ল্যান।

মায়ামি থেকে নিউ ইয়র্ক হয়ে দুবাই পৌঁছে মাকে sms করলাম আমি একটা সেমিনারে খুব ব্যাস্ত আছি, ফোন করতে পারছি না। মা উত্তর দিল "ঠিক মত খেয়ে নিস"।
এই খাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে এত ইয়ে... যাকগে, কথা না বাড়িয়ে আমি চকোলেট কিনতে গেলাম।

কলকাতা পৌঁছে দেখি ফোনটা কাজ করছে না। বিরক্তিকর ব্যাপার, তারপর সুটকেসও আসছে না। ইতি উতি ঘুরছি আর ভাবছি কেন এত দেরি - হঠাৎ শুনি আমার নাম ঘোষণা করছে। (নিউ ইয়র্কেও গমগমে স্পিকারে বিকৃত উচ্চারণে আমাকে ডাকাডাকি করা হচ্ছিল, কারণ আরেকটু হলে প্লেন মিস করছিলাম)। তো স্যুটপরিহিত চিমসেপানা এক ছোকরা আমাকে সবিনয়ে জানাল যে আমার সুটকেস আসে নি। আমি যত বাংলা বলি সে তত ইংরিজি বলে। তারপর গুচ্ছের ফর্ম ধরিয়ে ভরতি করতে দেয়, যেন দোষটা আমারি। ঝাড়া আধ ঘণ্টা লাগলো সেই baggage report তৈরি করতে, তারপর তারা বড় সাহেবের কাছে সই করাতে গেল। আমি এর মধ্যে গটগট করে বেরিয়ে বনি /  ভোঁদুকে বলতে গেলাম কেন আমার দেরি হচ্ছে । ফেরার সময় পুলিশদাদা আটকাতে গিয়ে বেজায় ধমক খেল। খিদে পেয়েছে, ঘুম পেয়েছে, সুটকেস আসে নি, এই সময় ধাষ্টামো ?

বাড়ি পৌঁছে বনিদের একটু পেছনে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। মা গেট বন্ধ করতে যাচ্ছিল, আমাকে দেখে কির'ম যেন স্ট্যাচু হয়ে গেল। তারপর তড়বড় করে "একি? তুই এসেছিস? এরম তো কথা ছিল না? কি ব্যাপার? কি কাণ্ড! কি মজা!!" ইত্যাদি নানা সব বলতে লাগলো। তারপর পিঙ্গুকে অনেক আদর করল, বনির পিঠে হাত বোলাল, আর উত্তেজিত হয়ে এঘর ওঘর করতে লাগলো।

আমি এদিক ওদিক ওপর নিচ দৌড়ে সবাইকে জানিয়ে এলাম আমার আগমন বার্তা। চিরন্তন ফিতে হাতে মামী এসে হাজির, মামা ক্রসওয়ার্ড এর কাগজ শুদ্ধু উঠে এসেছে, পিঙ্গু নেচে কেঁদে একসা করছে, দিদু ঘুম থেকে উঠে পড়েছে -  বাড়িতে প্রচন্ড হট্টগোল শুরু হোল। তার মধ্যে মায়ের স্রোতের মত প্রশ্ন " গিজার চালাবো? কোথায় ঘুমোবি, তিনতলায় নাকি এখানে? চা খাবি? ইস কি কান্ড! কবে বেরিয়েছিস? সেমিনারটা গুল ছিল?? বনি সব জানত কিন্তু আমায় কিছু বলে নি? হিইইইইইই!! "

পিঙ্গু এদিকে দিশেহারা হয়ে একবার বড় খাট একবার ডিভান লাফ দিচ্ছিল, কোঁওওও কুঁউউঁউঁ নানারকম আওয়াজ করে। তারপর একদম velcro হয়ে গদগদ মুখ করে হাত/গলা/মুখ চেটেই চলল, আর ক্ষণে ক্ষণে handshake করল (পিঙ্গু ভয় পেলে, অথবা প্রচন্ড আনন্দিত হলে হাসি/কান্না মুখে handshake করে)। তারপর পেছন পেছন দৌড়তে লাগলো ওপর নিচ, আমার সঙ্গে বাথরুমেও ঢুকে গেছিল। মা যখন তাকে খাওয়াতে বসাল, মাঝে মাঝেই ঘাড় কাত করে দেখে নিচ্ছিল আমরা ঘরে আছি কিনা, একবার ঝোল-মাখা মুখে এসে ঢুঁসিয়ে গেল। সেদিন রাত্রে গরম লাগা সত্ত্বেও বড় খাটে আমাদের মধ্যে শুল, আর ঘুমের মধ্যে কিরম যেন সাঁতার কাটার মত করছিল। 

সুটকেস নেই, চানটান করে বনির পাজামা আর টি শার্ট পরে ফোন করলাম। "দিদি? আমি এসে গেছি, তুই কাল আয় শিগগির (তুই কি সত্যি পাগল পম, ডেলি প্যাসেঞ্জার নাকি?) ঝুম? হাহাহা ইয়েস আমি আবার চলে এসেছি (এটা তুইই পারিস...সোনামাসি কতায়? কতায়?) ভিক্স!! আরে এটা আমি - নতুন নম্বর কারন পুরনো সিমটা ভোঁদাফোন নারায়ণ করে দিয়েছে (তুই যে কেন ফেরত যাস সেটাই আমি বুঝি না...দিদিভাই এসেছ? ভেরি গুড - এটা বুবুন) তারপর প্রদীপ্ত কে একটা মেসেজ করে দিলাম, দিনের বেলা ফোনে কথা বলার সময় দেন না Dr. Rosenberg"...যাকে সবাই "Lion King" বলে ডাকে...

ওদিকে মা জনে জনে ফোন করে খবর দিচ্ছে - "ঠাকুরপো? কেমন আছ? হাঁটু ব্যথা কমেছে? মা ভাল আছেন...এই ত...আজ  কি হোল বল তো? একটু আগে মাম্পু এসে পৌঁছেছে। হ্যাঁ!! আমি তো কিছুই জানি না, তকাই বলল ইলিশ মাছের ঝোল করে রাখ আর কফি কাস্টার্ড, আমি ভেবেছি শনিবার বলে বোধয়...তারপর দেখি সিঁড়ি দিয়ে "হ্যালো মা" বলে উঠছে। আমি যে তখন কি করব কি বলব ভেবেই পাচ্ছি না...  মাথা গুলিয়ে গেছে...হ্যাঁ সাত দিন মাত্র সময়, রাত্তির জেগে অফিস করবে..."
"টুকা? কি করছিস? না এখন খাব কি, সবে এগারটা বাজল। আজ কি হয়েছে বল তো? একটু আগে মাম্পু এসে পৌঁছেছে......(বাকিটা আর লিখলাম না)
" অমুক? কেমন আছ? আজ কি হয়েছে বল তো?" ইত্যাদি

খেতে বসতে বসতে রাত্তির পৌনে একটা বাজল। বনি মেথি চিকেন বানিয়েছিল - দারুণ খেতে হয় সেটা - আর মা করেছিল ইলিশ মাছ। খেতে খেতে কথা হচ্ছে মাছের কত দাম কি বৃত্তান্ত..মা বলল ইলিশ মাছ তো আমার পথ্য, ডাক্তার খেতে বলেছে ওমেগা থ্রি আছে বলে, কিন্তু যা দাম - রোজ কি আর খাওয়া যায়? বনি খুব গম্ভীর হয়ে বলল "তাহলে কাল থেকে ওমেগা থ্রি ক্যাপসুল দিয়ে পাঁচ ফোড়নের ঝোল বানিও"।

এঁটো হাতে আড্ডা মারছি, দেড়টা বাজে - মামা এসে পড়ল। হাতে একটা বাটি। পেছনে চিরুনি হাতে মামী।
আমি - একি মামা এখন খাও নি?
মামা (ব্যাজার মুখে) - না আর কি খাব, বিকেলে মামী এমন এক ধামা মুড়ি বাদাম দিয়েছে, পেট ঢাই হয়ে আছে...
মামী (বিস্মিত) - এক ধামা? এইটুকু বাটিতে মুড়ি দিলাম তো, আর তুমিই চাইলে...
আমি (কাজিয়াটা আটকে) বাটিতে কি?
মামা - এটা হোল চিংড়ি মাছ, খেয়ে নে।
আমি - এখন তো মিষ্টি খেয়ে ফেললাম, কাল খাব নাহয়?
মামা - এটাও মিষ্টি, ওনলি গোলমরিচ আর বাতাবিলেবু দেওয়া।
আমি (হাঁ করে) - বাতাবিলেবু?
মামী - দেখ না আমি বলেছিলাম একটা রেসিপি পেয়েছি, অমনি রান্নাঘরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল - আচ্ছা কাল খাস।
মামা - ঠিক হ্যায়, সামনের সপ্তাহে বিরিয়ানি করব নাহয়, আর স্লাইট ভেটকি ফীলে।

আমরা সমবেত কণ্ঠে আনন্দ প্রকাশ করলাম। নানা আড্ডা হাহা হিহি চলল ভোর রাত্তির অব্দি। শুতে যাওয়ার সময় শুনি কাক ডাকছে। আহ! কদ্দিন পর কাকের ডাক! 

নববর্ষের দেড়দিন


তেরই এপ্রিল। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে ধড়মড় করে উঠলাম সাড়ে সাতটার সময় – উঠে দেখি সে সাজসজ্জা করে বাসী কফি খেয়ে কাজে বেরিয়ে গেছে। এদিকে ফোনটা টেবিল বিরাজমান আর আমার চাবির গোছাটা নেই; তার মানে যে গাড়িতে তেল নেই, সেটাই নিয়ে বেরিয়েছে। আবার ফোন ফেলে গেছে, কি অদ্ভুত আক্কেল! এই সব সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে দরজা জানলা খুলে দেখি ফটফটে নীল আকাশ, প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে, বোগেনভিলিয়াতে তিনটে-পাঁচটা ফুল এসেছে। মনটা খুশি হয়ে উঠলো – আজ শুক্কুরবার, কাল পয়লা বৈশাখ!

কফি বসিয়ে চট করে আপিসের ইমেল দেখে আনন্দবাজার পড়তে যাব যাব করছি, এমন সময় আমার ক্লিনিং লেডি এসে উপস্থিত। কি ব্যাপার – আজ তো তার আসার কথা না? এর কথা একটু বলে নি, নাম ফাবিওলা, ধাম কলম্বিয়া। সেখানে উকিল ছিল, তারপর অ্যামেরিকায় এসে ইংরিজি শেখার অনিচ্ছের দরুণ এখন বাড়ি পরিষ্কারের ব্যবসা করে। আমার থেকেও বাতিকগ্রস্ত, আর এতই বাক্যবাগীশ যে ওর ইংরিজি অথবা আমার স্প্যানিশ বলতে না পারায় ওর কিচ্ছু আসে-যায় না ।

তো সে আজ এসেছে কেন? দরজা খুলে আমি হেসেটেসে গুড মর্নিং বললাম,তারপর জিগ্যেস করলাম - "today why come?" ওর সঙ্গে সাধারণতঃ এইভাবে কথোপকথন চালাতে হয়। উত্তরে সে একগঙ্গা কথা বলে গেল, যার মধ্যে থেকে আমি "pero", "como se ise", "columbia" "manana" এই কটা কথা ধরতে পারলাম. কিন্তু গোটা বক্তব্যটা বোঝা গেল না। অগত্যা Google Translate খুললাম কম্পিউটারে (সময়বিশেষে ওর সঙ্গে এভাবেও কথোপকথন চালাতে হয়)। 

অনেক পরিশ্রমের ফলস্বরূপ জানা গেল যে ওরা দশদিনের জন্যে "দেশে" যাচ্ছে তাই আজ আমার বাড়ি পরিষ্কার করতে এসেছে।

ভালই হলো - সংক্রান্তির দিনে "বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক", Vacuum-cleaner এর হাঁড়িচাঁছা শব্দে বাড়ি মুখরিত হলো | ফাবিওলা পাপোশ, ছোট কার্পেট ইত্যাদি সোফার ওপর তুলে রেখে, যত্রতত্র জুতোপায়ে ঘুরে ঘুরে পরিষ্কার করতে লাগলো। আমি শিউরে উঠে কাজে মন দিলাম - যস্মিন্‌ দেশে যদাচার।

ঘন্টাদুয়েক পরের কথা। কাজে মনটা বেশ ডুবে এসেছে, আরেক কাপ কফি আর গোটা পাঁচেক krackjack বিস্কুট শেষ করে এনেছি, এমন সময় +৯১ নম্বর থেকে ফোন। চমকে উঠে ঘড়ি দেখলাম - কলকাতায়ে মাত্র রাত্তির ন'টা, এই অসময়ে ফোন কেন? "হ্যালো, মা? কি ব্যাপার? রেখে দাও, আমি করছি – না, মিটিং নেই , থাকলে ফোন ধরলাম কি করে? দেড় কিলো মাছ রান্না হচ্ছে? বাঃ দারুণ ব্যাপার মা – না, এখানে কাতলা মাছ পাওয়া যায় না, আর কাঁচা আম এখনো দেখি নি.. নতুন জামা? আছে। আমি তোমায় পরে ফোন করছি মা।" সংক্রান্তি উপলক্ষে বাড়িতে আম-মাছ রান্না হচ্ছে; ঝোলটা বেজায় ভালো হয়, এদিকে কাতলা মাছ আমার দু-চোখের বিষ, দেখলেই গা পিত্তি জ্বলে যায়। বেশ একটা হরিষে বিষাদ ব্যাপার।

ফাবিওলা ইতিমধ্যে কাজকর্ম শেষ করে এনেছে, যন্ত্রপাতি গুটিয়ে টাকা নিয়ে আকারে-ইঙ্গিতে জানালো যে ও আমার জন্যে কলম্বিয়ান কফি নিয়ে আসবে, আরো কি একটা আনবে সেটা বুঝতে পারলাম না – হাত দিয়ে চৌকো মত দেখাল – পোস্টকার্ড কিংবা চকোলেট বোধহয়। ওকে দুগ্গা দুগ্গা বলে এগিয়ে দিলাম, পয়লা বৈশাখে যাত্রা, ভালোয় ভালোয় ফিরে আসুক বাবা। ও আমার পরিষ্কারের definition খুব ভালো বোঝে।

দুপুর আসন্ন। কুইজ গ্রুপে খানিক আড্ডা মেরে কি খাওয়া যায় ভাবছি, পিড়িং পিড়িং করে Skype থেকে ডাকাডাকি| মামীর মুখ ভেসে উঠলো অচিরেই, পাশে মামীর মেয়ে। স্রোতের মত কথা ভেসে এলো " পম্পি? কানে ওটা কি লাগিয়েছিস? এমা, তোর মুখটা এমনি কালো কালো লাগছে কেন? চশমা পরেছিস লাল রঙের? আমেরিকাতে লোকে ফর্সা হয় আর মোটা হয়, আচ্ছা তোর এখন বিকেল না রাত?" ইত্যাদি ।
"মামী? এটা হেডফোন। আর আমার মুখে কিছু হয় নি, আলোর উল্টো দিকে আছি তাই, আর ফোন থেকে মুখটা distorted লাগছে। চশমা মোটেই লাল নয়। তুমি মাথায় ফিতে বেঁধেছ কেন?"
"এই তো ফিতেটা ফেলে গেছিলাম গতবার, এখন চুল বাঁধছি।আমরা ঝুমকির কাছে এসেছি, জানিস তো? আচ্ছা তোরা নববর্ষে কি করবি?”
"জানি মামী, ঝুমকিই তো ফোনটা করলো, তুমি ওর কাছে না থাকলে কি করে তোমায় ওর ফোনে দেখছি? নববর্ষ বলে এখানে আলাদা কিছু বুঝছি না। আচ্ছা, Pixi কোথায়?"

বোনপোর আবির্ভাব, কপালে একটা লাল টিপ, মাথায় নানা রঙিন পালক লাগানো একটা মুকুট-জাতীয় কিছু। সে খানিকক্ষণ আমাকে বাঘের পিঠে খাওয়ার গল্প পড়ে শোনালো। তারপর ভিডিও দিয়ে আমার ফ্রিজের ভেতরটা দেখে নানা মন্তব্য করলো "কত্ত কত্ত আপেল! প্রেসার কুকের কই? কুকাম্বার নেই? ভেজিটেবিল?" (আমার ফ্রিজে সত্যি ভেজিটেবল নেই - রান্নার পাট outsource করা আছে এক পাঞ্জাবী মহিলার কাছে) তারপর ঠাকুরের তাক দেখে "সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে" আওড়ে, মুখ দিয়ে বিচিত্র "পুঁপুঁ" শব্দে শাঁখ বাজিয়ে, দুম করে ফোনটা কেটে দিল। অনেক চেষ্টা করেও আর লাইন পেলাম না। অগত্যা ক্ষুন্নিবৃত্তি করে আবার আপিস।

এরপর গতানুগতিক বিকেল সন্ধ্যে রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়ার পর রাতে মাকে মেসেজ করলাম। মা খুব ব্যাস্ত, পিঙ্গু (আমাদের গোল্ডেন রিট্রিভার) নিমপাতাসেদ্ধ জলে চান করছে, চায়ের সসপ্যানে নিমপাতা সেদ্ধ করা হয়েছে তাই চা তেতো, ঠাম্মা সেটা খেতে পারছে না, এদিকে বড়মাসি দক্ষিণেশ্বর গেছে তিনঘণ্টা হয়ে গেছে – এইসব নানা ঘটনা। নতুন বছরের প্রণাম জানিয়ে ফোন রাখলাম।

ঘুমোতে যাবার আগে টুক করে ফেসবুকে একটা উঁকি দিয়ে দেখি, ওমা! সন্তুদাদা বিয়ে করে ফেলেছে – আর ওদের ওখানে তো আজই পয়লা বৈশাখ! কানাডাবাসিনী সুসানকে “ডেট” করছিল শুনেছিলাম, কিন্তু দুম করে বিয়ে? বড়মাসি কলকাতায়, ওদিকে বিয়েটা অস্ট্রেলিয়ায় হয়েছে, পাত্রপাত্রী সবার বেশ হাশিখুশি ছবি উঠেছে – নিশ্চয়ই লুকিয়ে বিয়ে করছে না? যাক, নিশ্চিন্দি, নতুন বছরে নতুন জীবন শুরু। প্রদীপ্তকে খবরটা জানালাম। ও সন্তুদাদা, সুসান, কাউকেই চিনতে পারল না, কিন্তু বলল ভেরি গুড, খুব ভাল খবর, ওদের কনগ্রাচুলেশান্স জানিয়ে দে। চিঙ্কি সাধে আমাকে “mad-net” বলে?

পরের দিন। সকাল থেকে আকাশ কালো করে ঝড়বৃষ্টি আর আমার মন খারাপ – ইসস, কলকাতায় কালবৈশাখী হলে ছোটাছুটি করে আম কুড়োতাম, উড়ন্ত শিমূলতুলো ধরতাম। আর শিলাবৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। এখানে ছাই না শোনা যায় মেঘের গর্জন, না পাওয়া যায় বৃষ্টির গন্ধ, না দেখা যায় হাওয়ায় ওড়া খবরের কাগজ – এইসব গজগজ করছি আর রুপুদির বর্ষার গানের সিডিটা খুঁজছি, এমন সময় “ পিঙ্গি! কি করছিস, কেমন আছিস? আমরা বম্বে চলে যাচ্ছি, জিনিস সব প্যাক হয়ে গেছে, এখন হোটেলে আছি আর কারেন্ট নেই। আমি কাজ করে করে রোগা হয়ে গেলাম।” আটহাজার মাইল নস্যি করে দূরভাষে ভাইয়ের গলা, সঙ্গে বুবুন । খানিক আড্ডা মেরে দেখি বোনের মেসেজ “পয়লা বৈশাখে তোকে একটা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম, প্রদীপ্তদাকে হাফ।” ফোন করলাম, কিন্তু হিজিবিজি কথার ফাঁকে আদ্ধেক প্রণামটা কি ব্যাপার জেনে নেওয়া হলনা।

ওদিকে মা নেমন্তন্ন খেতে গেছে স-পিঙ্গু, ফিরতে দেরি হবে, এদিকে বৃষ্টি ধরে এল – আমাদের বেরোনোর কথা, খানিকদূরের একটা ছোট্ট শহরে যাব। ব্যাগপত্র গুছিয়ে হাইওয়েতে উঠে ফোন করলাম – কলকাতায় রাত্তির সাড়ে এগারোটা, মায়ের সবে সন্ধ্যে।
“আজ যা কাণ্ড হল না? বড়মাসি তো সেই সাতসকালে দক্ষিণেশ্বর গেছে সন্তুর বিয়ের পুজো দিতে একটা লাল সালওয়ার কামিজ পরে।” (আমি জানতাম না বিয়ে)
“সেকি, তোকে বলিনি ওরা পয়লা বৈশাখে বিয়ে করবে ঠিক করল? আমি একদম ভুলে গেছি – ছিঃ ছিঃ, তোকে জানানো উচিত ছিল।“ (ঠিক আছে মা, অত কিছু ছিছি করতে হবে না)
“না না তুই জানতে পারলিনা, এদিকে আমরা সবাই জানি।“ (তাতে কিচ্ছু এসে যায় না)
“তাহলে কাকে বললাম বল্‌তো?” (মা! তুমি থামবে? সারাদিন কি করলে বলো!)
“হ্যাঁ, সে পুজো দিতে গিয়ে সাড়ে তিনঘণ্টা ধরে গঙ্গায় চান করেছে, তারপর এমন টায়ার্ড হয়ে গেছে যে মন্দিরের অফিসে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে অফিসের লোকদের বলেছে, আমি বুড়োমানুষ, আমার হয়ে একটু পূজো দিয়ে আসবে ভাই? আমি স্নান করে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।“ (এটা অবিশ্বাস্য, মা, বড়মাসি ... নাঃ কিছু বলার নেই)
“তারপর এক চ্যাঙ্গারি প্রসাদ নিয়ে বাড়ি এলো বেলা দেড়টা। আমরা দুটো করে মাছ খেলাম। বিকেলে পিঙ্গুকে নতুন বাটি বার করে দিলাম, আমি নতুন শাড়ি পরে বেরোলাম। তোরা কি করছিস? আমি এখন বই পড়ব।“ (কটা বাজে মা? এত রাত্তির করছ কেন?)
“কোথায় রাত্তির? সবে তো পৌনে বারোটা বাজল!” (না, এখন রাত্তির কেন হবে, ঘোর দুপুর, যাও ঘুড়ি ওড়াও তাহলে)
“বোকা-বোকা কথা বলিস না, খামোখা ঘুড়ি ওড়াব কেন? এই তো একটু বইটা পড়ে নি, দেখি মামী যদি ফোন করে!” (মামী এখন ফোন করবে? তোমাদের প্রব্লেমটা কি বল তো?)
“প্যাঁকপ্যাঁক করিস না তো – আমাকে আমার মত থাকতে দাও, ব্যাস্‌!” (হোপলেস, মা। ঠিক আছে, টাটা গুড নাইট।)
“নতুন বছরের অনেক আশীর্বাদ নিস তোরা। শুভ নববর্ষ।”

পয়লা বৈশাখ অবশেষে অস্ট্রেলিয়া হয়ে কলকাতা ছুঁয়ে মায়ামিতে নতুন বছর শুরু করল। ১৪১৯ সালে সবার শুভ হোক্‌।

শুভ নববর্ষ!



(April, 2012)

Kojagori


Lakshmi Puja. Or Lokhhi Pujo, as we Bengalis say. Relatively easy to execute; niyoms are not too stringent, and one does not necessarily need a Purohit to reign over the proceedings. So Lokhhi Pujo it was, this year. My first “independent” pujo, outside of home. And the husband’s craving for luchi/begunbhaja/payesh contributed significantly to his enthusiastic “pujor bajar” drive, fifty kilometers north of Miami.

The plan took shape in tentative steps. What does one do, to begin with? Not being the ritualistic one, frantic phone calls were made to Ma and Mami.
They were super excited. Conversation follows -
“ Ei to, kichhu na, khoob shoja. Eita eita laagbe…“ (list of a dozen different things, and then helpful suggestions for alternatives)
“Ponchoshoshyo ache? Na na pNaachphoron diye hobe na, shudhu chaal diye dish. Daab na pele je kono gota phol ghawte boshiye dish."
"Lal gamch nei? ekta rumal diye ghawt dheke dibi.…notun rumal ache to? Paper napkin hole..nah, paper napkin e hobe na"
"Belpata/tulshipata pawa jachhe na? Ma Lokhhi to shobi janen, bole dish ekhane oshob pawa jay na… na shukno basil leaf dewar dorkar nei”

Probashe niyom nasti.

Jotted down the shopping list and started exploring Indian Grocery stores as far and wide as possible. Chandan – laal and shada – check. Gongajol in a little bottle – check (“Ota Haridwar branded tap water” – helpful commentary from husband) Tamar ghot, prodip, sholte, notun kapor, narkol (“chholar daal hobe bujhi?”) paan, shupuri, korpur – check. Five fruits, five veggies for the fritters, moyda, shuji, mishti – check. Zinc oxide? Not available. Poster color it is then, for the alpona.

Calls to Ma again for process and sequence of pujo, and details on naibidya and bhog. Strange-ish conversation follows -
Ma - ponchoprodip, korpur, dhup, jol-shonkho, phul, pakha ei shob diye aaroti korbi
Ami - jol-shonkho nei. pakha nei. Emni shNaakh e ektu jol diye aaroti kore debo, ar kagoj diye pakha baniye nebo, hnya?
Ma - thik ache, pNachali ache to?
Ami - Chinky boleche ipad e download kore debe.
Ma - thik ache, nibedon kore nish.
Ami - ipad ta nibedon kore debo?
Ma - na na, oi bhog phol prosad ei shobe ektu gongajol chitiye nibedon kore dish.
Ami - achha Ghawte ki jeno ekta aaNkte hoy
Ma - hNya kathi kathi haat pa ola manush - prothome ekta plus aaNk. Tarpor opore ekta golmoto mukh, haat pa gulo extend kore laterally...
Ami - lateral abar ki, bairer dike korbo to?
Ma - lateral medial bujhish na! medial mane towards the midpoint of the body, lateral mane..
Ami - na o shob daktari byapar - pujor modhhye lateral medial hijibiji ..dhutteri. Haat pa gulo tene tene bairer dik kore debo, ei to?
Ma - hNya ar proportion ta thik rakhish mane gola pet haat paa..
Ami - offf Ma!! Achha ami rakhchi ekhon.

Pujo morning. Garland for the “ghot”, strung and preserved in the fridge to avoid wilting.  Gobindobhog chaal soaked for naibidya. Payesh made. Bhog ingredients waiting to be cooked by Chinky, who is flying in this evening. In all this pujo excitement, I almost forget I have meetings and work and suchlike mundane things to do. But the day is relatively light and I am pretty much done by noon, thanks to suspected divine intervention.

Afternoon. I walk in the neighbourhood, looking for a public mango tree. While almost every house has various mango trees in their yards, I am looking for one that a) has some procurable stems within reach b) is relatively less conspicuous. Voila! Returning home with my precious 7-leafed stem, I collect some Kolapata, Jui and Jaba too, from random neighbour's yards. Pujo is a community affair, after all, so no harm done. And I am greatly pleased with meself.

Evening. Furniture moved to accommodate the pujo sprawl, I collect multiple little silver “Lokhhi Thakur” idols and arrange then on a small teapoy. (That word, incidentally, has come from “tepaya” and has nothing to do with tea.) Clay lamps and incense sticks ready to be lit. I put all the "upochaar" in little pieces of "kolapata"- prodip, shNaakh, chandan, shidur, gongajol in a little onyx jar, korpur, ghawt. Try some alpona with poster colour and not satisfied with the finished product, I crush rice in a recently aquired "haman-dista", make a white paste out of it, and paint some more. NOW the alpona comes out better. Yay!

Husband fetches Chinky from airport. General sense of wonder at the transformation of the living room and the "pujo pujo gondho". I feel pretty smug :) Cooking, cutting, frying etc completed, Chinky and I change into saris and start Pujo around 11. Husband graces the occasion by pairing a panjabi with bermudas, and picking from the bhog plate. Reminds me, not oddly, of "Manojder Obbhut Bari".

Purnima. Sitting on the Aashon,  I try to imitate Mami - our facto purut-thakurun - and sprinkle Gongajol on the offerings, then chant all the Mantras I can recall, including invocations for Durga, Shib, Narayan, Kali, Chandi, Saraswati and Lakshmi, of course. I figure since they all belong to one big happy family, Ma Lokhhi wouldn’t mind sharing her pujo the other gods and goddesses. Follow this up with nice stick-figure on copper Ghawt, place mango leaves, coconut and pretty red cloth on top and cover with now-almost-frozen garland. Start with iPad pNachali reading, which goes smoother than I expected. Pnachali reading done, perform Aaroti sans the "pakha", offer pushpanjoli, and that’s it! We are done with Pujo.

I feel strangely lightheaded and realize that I had forgotten to eat anything all day. Which is as it should be.

Dinner follows, along with proshad/bhog eating and soon, the moon has traversed half the sky. Mission well accomplished, we retire happy and exhausted, but not before I've done a quick photo-upload on Facebook and called Ma to report on successful completion of my first Pujo.

And later, in a moment of quiet contemplation, a thought that was hovering at the  back of my mind, defines itself clear and true. I realize that I didn’t do this Pujo for overarching religious reasons, or because I badly wanted to appease Ma Lokhhi. (In fact, I have always felt closed to Ma Saraswati for some inexplicable reason)

So why did I ? For a purely selfish purpose - to make my little Miami home  a part of P544, Raja Basanta Roy Road. To reconnect with memories of childhood, the familiarity of sandalwood, incense, and holy fire. The calming sound of littany and the sonority of conchshells. The soft hues of oil lamps. The stunning contrasts in bright flowers on a green leaf. The smell of ghee-korpur-chandan-agaru. The fulfillment of togetherness. And the indescribable feeling of being whole, again.

And, our "tintolar thakurghor" extended its reach across seven seas to enfold us in its space. Purnamadah Purnamidam.

We were blessed.

(October, 2011)

And we continue to be...different


In carrying on with the madness that runs in the family, my mum once introduced me to a guest as follows: "e to amar nijer bon, amar chhoto bon, Boston e thaake". 

It was unnerving that I had just become my mother's youngest sister.

Boromashi hasnt changed. In the recent past, we found out that a beloved "mama" of ours had one kidney instead of two. In ruminating about this during a post-dinner adda, Boromashi said hopelessly " ishh, Ranjon er ektai matro kidney. Konodin dekhbi hoyto amar matro ektai heart."

Needless to say, we've been talking about her lone heart ever since.

(Sometime in 2010)

Tarpor...



Chhoy mash hoye gelo Boromashi kolkatae esheche. shei je Apriler tibro goromer modhhe Millie ke niye je hajir hoyechilo, tarpor Gongae onek jol goriyeche :) ekhon haradhon er doshti pakhi theke 8 hoye, tarpor 7 hoye, ekhon 6ti te eshe dariyeche. Khorgosh duto amader khoob disappoint koreche, tai oder Monidir *amader cook*  bari te nirbashon dewa hoyeche. Aage likhechilam oder nam Neffi ar Cleo. Tarpor ekdin dekha gelo khNachay ekta jyanto ar duto mawra bachha. Taate amra realise korlam je Neffir nam palte Alexader ba Antony kora dorkar, ebong ei bishwashbhonge amar bon jarpornai khunno hoye porlo. Otoed, ek shubho robibar Monidi matador niye eshe kNacha, khorgosh, 4te bNadakopi, ek bosta khor ar du aaNti kolmi shaak bari niye gelo. Ekhon tara shukhe ghorkonna korche, shunechi bikele gujiya khaay.

Millie jotro totro gotto khNure rakhche ajkal. Bari te ar ektao tiktiki nei, tai o besh mushre porechilo, kintu bhogoban or dukhho bujhelen. Ekdin raate ekti nengti iNdur ki kore jani Millie naaker shamne eshe porechilo. Tarporer dui ghonta Millie shei iNdur ke tara kore beralo, shesh mesh ek tukro lyaj mukhe niye bijoyee hoye boromashi ke eshe proudly present korlo. To, ekhon shei iNdur er baki ta dhorar jonne honne Millie shara bagane gotto korche. No luck; iNdur arale boshe muchki hashche, thik Jerry style e.

Boromashi jomiye bosheche. Kena hoyeche oven, cooking range, fridge, washing machine, vacuum cleaner *sheta abar double up kore Millier exercise er jontro hishebe..shara ghor ota ke chase korlei naki Millie roga hoye jaabe*. Aro kena hoyeche ekta boro rug, ekta lomba rug, gota shatek paposh, onek cusion. Boromashir shongshaare prochur soft toy, protitai Millier, protitar pet phata, nak/chokh missing. Ekmatro exception holo Big Teddy, jeta ke ekta balisher cover poriye rokhha kore hoyeche, ebong jar pashe chit hoye shuye phoor phoor kore nak deke Millie sleepu kore.

Amader hoyeche prochur moja. Fridge bhorti nanabidho upadeyo khaddo. Pantry te prochur chips, badam, chocolate. Boromashir kache ektu aabdar korlei polao kalia cake tek. Ei anonde bari te du duto party hoye gelo, boromashi moner anonde lokjon ke khawalo, Millie prochur haar kheye porer dim bomi korlo.

(Autumn, 2005)

My Family and Other Animals" (... with due homage and apologies to Gerald Durrell)


Ours is a funny family. Animals included.

Once, our cooking gas cylinder leaked, in the middle of the night. The folks from the emergency service came in at 3:00 AM, to find mama starting to eat dinner, Bonnie watching a football game and loudly cheering Manchester United, Ma making tea, mami solving a Bangla crossword puzzle, and me on the computer, laughing at some joke on the cyber world. They were surprised. We were surprised that they were surprised.

"But I don't want to go among mad people," Alice remarked.
"Oh, you can't help that," said the Cat. "We're all mad here. I'm mad. You're mad."
"How do you know I'm mad?" asked Alice.
"You must be," said the Cat, "or you wouldn't have come here."

Gullu, our Japanese Spitz, likes salami for breakfast, prefers Coke to Mirinda, and does not consider himself a dog. A stray cat is found sitting gNyat on the mat in the living room. Not surprising. We are all used to some normal level of insanity in the house. But, things started getting curiouser and curiouser, when my Boromashi landed up last month, with a fresh whiff of life, unbound energy of a 64-year young lady, eager enthusiasm in returning home after forty years, 10 chattering birds, 2 docile and furry baby-rabbits and one over-excited Jack Russell Terrier named Millie. Now, there is a general rise in the level of normalcy at home, curve tending upwards.

The birds have interesting first names like Rabri, Lalu, Shundori, Hitler, Kochi, Tioti, Raju, Ria, Freddieand Friya. They chatter and chirp all day, sometimes getting into mock fights and tearing neck feathers off each other. My sister is unimpressed with them bird brained creatures. The more interesting rabbits are called Cleopatra (blue eyes, white and grey fur) and Nefertiti (red eyes, brown and white fur), nicknamed Cleo and Neffi. They happily eat all day. I mean all day. Given food, theywill eat. We are too softhearted to keep them on a diet. They will have to start eating cabbage flavoured with Entero-quinol, pretty soon.

Millie has already proven her stripes by trying to eat a lovebird. She ended up tearing off some blue feathers and pawing the rabbit cage so violently that she upset the cage. Poor Millie! A terrier is a hunting breed. Now, she alternates between mournfully sleeping when leashed, and frantically peeling the paint off the doors, when locked. Lately, though, she has begun killing time by chasing tiktikis. A good way to deal with the frustration! All night, she diligently climbs the dining table, TV, my work desk and other "high" places, in her futile search for one, just one, tiktiki. She might need therapy, methinks.

Gullu is nonchalant to this entire hullabaloo. His age, grace and dignity are beyond such juvenile delinquency. He comes in, observes the baby rabbits with polite interest, reprimands Millie's mad attempts to eat them alive with a disdainful look, and retires to his place of honor in front of the kitchen, to look at life pass by.

Boromashi is having a good time, tending her grandchildren, "Aayi Rabri ! Ekdom bachha der thokraabe na! Oi Tioti! Tumi chan korcho na keno? Hello Friya, where is your nest? Good boy, Freddie, come hiya!" Training a terrier to curb her instincts, "MILLIE!! They are your children-ee! No bite-oo! You will get big smacky! Naughty mashi you are!! Say sorry to little birdie you tried to eat today," etc., and generally having a ball.

(Spring, 2005)