June 16, 2013

ষাট সত্তর

আমরা অবশ্য খোদ ষষ্ঠী ঠাকরুনের পুতুল বানাবো না, সেটা মামীর ডোমেইন। আমরা বানাবো ছানাপোনা - একটা ছোটো গুল্লি দিয়ে মুন্ডু, একটা বড় গুল্লি দিয়ে ধড়, সেটা থেকে বড়ির নাকের মত টেনে টেনে হাত পা, কালোজিরে দিয়ে চোখ - হয়ে গেল ষেটের বাছা। এহেন শিল্পকর্ম সম্পন্ন করে নিজেরাই হেসে কুটিপাটি, তারপর আবার বেড়াল পুতুলটা দেখে মাকড়সা মনে হচ্ছিল কারণ হাত পা লেজ গোঁপ সবই এক সাইজ। মামীর ষষ্ঠী পুতুলের লাল টিপ, লাল পাড় শাড়ি, তেনাকে পিঁড়িতে বসিয়ে কোলে কাঁখে পোনাদের স্থাপনা করা হল, পেছনদিকে একটা বটগাছের ডাল দিয়ে এক টুকরো স্নিগ্ধ সবুজ চালচিত্র হলো, শাঁখ বাজলো, ধুপ জ্বললো। বাইরে তখন আষাড় মাসের "ছায়া ঘনাইছে"। 

এর মধ্যে মাসি মেসো দাদা দিদি এসে পড়েছে, বানা বানানো শুরু হয়ে গেছে। একটা কাঁঠাল পাতায় একটু করে লিচু, জাম, আম, নারকোলকোরা, দই, ক্ষীর, কাউনের চাল, মিষ্টি। কিছু অ-কাঁঠাল, কিছু স-কাঁঠাল। এই পাতার মধ্যের মিক্সচারটা অনবদ্য খেতে - আর অবলীলায় সুরুত করে মুখে ঢুকে যায়। তারপর পাতাটা চেটে, প্লেটে গুছিয়ে রাখতে হয়, কারণ পরে গোনা হবে কে কটা খেয়েছে।

সে তো পরের কথা, ঠাকুরের ভোগে লোভ দিতে নেই - আপাতত থালায় সারি সারি বানা শোভা পেতে লাগলো, আশেপাশে পঞ্চপ্রদীপ কর্পুর জলশঙ্খ ইত্যাদি আরতির নানা উপচার। প্রদীপ জ্বালা হলো, শাঁখ কাঁসর ঘন্টা বাজলো, ঘটাপটা করে পুজো শুরু হলো। নিবেদন, আরতি, পাঁচালি, শান্তিরজল। ব্যাস, এইবার আসল আনন্দ শুরু। দিদু তার সব সন্তানদের পাখা দিয়ে হওয়া করে, হাতে হলুদ সুতো বেঁধে দিল। এরপর আমরা সারসার মাথা পেতে নিলডাউন হলাম, এক ধারসে তিন-চারটে পাখা আর দুব্বোঘাসের জলের ছিটে পড়তে লাগলো, সঙ্গে ছড়া - "কাটল কাটল মাসির শাড়ি তবু বলি ষাট ষাট, কাটল কাটল পিসির নাক, তবু বলি ষাট ষাট " (যদিও এই উক্তি আমরা কোনদিন পরীক্ষা করি নি) গুল্লুও হাসিহাসি মুখে পাখার হওয়া খেল। তারপর আমাদের হাতে সুতো বাঁধন আর অনতিবিলম্বে সুতোর মধ্যে থেকে দুর্বা/বাঁশের শীষ খুলে ফেলন কারণ ওগুলো হাতে ফোটে। তারপরই হুড়োহুড়ি করে প্রসাদ বন্টন এবং ভক্ষণ - অচিরেই আশেপাশে খালি পাতা স্তূপীকৃত হলো। আর বিকেলে যারা আসবেন তাঁদের জন্যে কিছু রইলো না বলে কিছু বেসিক বানা আবার বানানো হলো।

এর পরে দুপুরের একসাথে খাওয়া - পাঁচ ভাজা নিমবেগুন লাল শাক (প্লাস কাসুন্দী), ডাল শুক্তো মাছ, করমচার চাটনি, দই মিষ্টি। মোয়া তক্তি নাড়ু গুলো বিকেলের জলখাবার খাওয়া হবে, সঙ্গে মুড়ি আর চা। রাত্রে বাবা মাংস রান্না করবে।

দিবাভোজের পরে দিবাআড্ডা - দিদুর বড় কার্পেটে তাকিয়া বালিশ নিয়ে সবাই গড়িমসি, সঙ্গে অজস্র হাহা হীহী, আষাড়ে গল্প, অকারণ পুলক, অনাবিল আনন্দ। বাইরে নীলমনি ফুল ঝরে পড়ছে, কৃষ্ণচূড়া কলকেফুল কালো মেঘের গায়ে রঙ্গীন চুমকির মত জ্বলজ্বল করছে। কাল থেকে আবার দৈনন্দিন জীবন শুরু, কিন্তু বাঙালীর তো বছরভর পাবন - রথ টানা, রাখি বাঁধা, ঘুড়ি ওড়ানো...

আমাদের যৌথ পরিবার। শিকড় অভিন্ন রেখে দেশে বিদেশে যে ফুলেরা আজ ফুটে আছে, সবাই সেই পি ৫৪৪ এর সৌরভের সাথী।



June 15, 2013

ষাট ষাট

ইতিহাস জামাইষষ্ঠী নিয়ে আদিখ্যেতা করলেও গুনিজন মাত্রেই জানেন যে ষষ্ঠীপুজোর রকমফের আছে, যথা নীল, জামাই, শীতল ও অন্যান্য। আমাদের বাড়িতে জুনমাসের যে ষষ্ঠীপুজো হয়, সেটায় পুজো এলিমেন্ট কম, পার্বন বেশি। আর সেদিন জামাই বলে নয়, বাড়ির সব সন্তানরাই আদর পেয়ে থাকে। আর ব্যাপারটা যেহেতু গরমের ছুটির মধ্যে, তাই পড়াশোনা নিয়ে সেদিন বা তার আগের দিন বা তার পরের দিন বিশেষ মাথা না ঘামালেও চলে। অতএব, জুন-ষষ্ঠী আমাদের কাছে খুবই আকর্ষক একটা দিন ছিল। বড় হয়েও আকর্ষণ কমে নি, কিন্তু ছোটবেলার স্মৃতিগুলো বেজায় ভীড় করছে...

দিন চারেক আগে থেকে রং মিলিয়ে মিলিয়ে নতুন জামাপত্র কিনে রাখা হলো, দিদুর অর্ডারে। আমাদের বোনেদের ফ্রক, ভাইএর পাঞ্জাবি, মামা আর বাবার টিশার্ট, মা মামীর শাড়ি, গৌরদার ফতুয়া।আগের দিন রাত্রে মামী কাউনের চাল ভিজিয়ে রাখল, আর খইএর মোয়াতে পাক দেওয়া হলো - তার গন্ধে আমাদের প্রাণ উদাস। আমরা ভাইবোনেরা অজস্র কাঁঠাল পাতা ছেঁটে রাখলাম, আর খাবার ঘরের সাইডবোর্ডে নতুন সুতো, হলুদ, ফুল, বেলপাতা, দুব্বো, ফল, মিষ্টি, কাঁচি এইসব সারসার সাজিয়ে রাখা হলো। গৌরদা যাদবদাস থেকে দই এনেছে, আর লেবু সন্দেশ। মামা এনেছে কালোজাম কাঁঠাল আম লিচু জামরুল, ইলিশ / পাবদা, নারকোল। বাবা মনোহর পুকুর রোড এর সেই স্পেশাল দোকান থেকে মাংস এনেছে, সেটা পরের দিন রাত্রে খাওয়া হবে। এলার্ম দিয়ে শুলাম, ভোরে উঠে মাদার ডেয়ারী-ওয়ালাকে ধরে দু প্যাকেট দুধ বেশি নিতে হবে, ক্ষীর তৈরী হবে। (কিড়িং করে এলার্ম হয়ত বেজেছিল, আমরা উঠি নি। বিপত্তারিনি মামী কিম্বা গৌরদাই দুধ কিনে, বড় পেতলের কড়ায় ক্ষীর করতে বসিয়ে দিয়েছিল)


আমাদের উঠতে উঠতে মা দের চানটান সারা, চুল-ধোয়া জল বাটিতে রাখা হয়েছে, করমচা ধান বাঁশের-কুড়ুল দুর্বা দিয়ে পুঁটলি বাঁধা হয়েছে, হাতপাখার ওপর সেই পুঁটলি, বড় আম, আর জলের বাটি রাখা হয়েছে । ঠাকুরঘর থেকে তিনতলার বড়ঘরে প্রদীপ, পিলসুজ, কাঁসর, ঘন্টা, শাঁখ, পুষ্পপাত্র, কোশাকুশি, পাথরের থালা বাটি গেলাস সব আনা হয়েছে। আল্পনা আঁকা শেষ, তার ওপর বড় পিঁড়ি বসানো হয়েছে, ভানুদি, মনিদি, মলিনাদি সবাই খুব ব্যস্ত রান্নাঘরে - নারকোল নাড়ু, তিলের তক্তি, আরো নানান্ খানা তৈরী হচ্ছে। বারো আনা কাজই শুরু হয়ে শেষ হতে চলেছে।


তাতে অবশ্য আমাদের কিছু এসে যায় না কারণ আমরা ছোটো। কাজেই চা-টা খেয়ে চান করে নতুন জামাকাপড় পরে ছোটোদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।চন্দন বাটা, পঞ্চপ্রদীপের সলতে সাজানো, লিচু ছাড়ানো, কালোজাম-আম-জামরুল কাটা, (দু-একটি খাওয়া) আর চালের গুড়ো-ময়দা দিয়ে মা ষষ্ঠী র পুতুল তৈরী করা। 




(পরের কিস্তি এখানে : http://bokombokom.blogspot.com/2013/06/blog-post_16.html)






June 11, 2013

The Sixth Day

(the Bengali version is here : http://bokombokom.blogspot.com/2013/06/blog-post.html )

History has pegged Jamaishoshthi as an important and integral part of every Bengali household. What is not so widely known is that in many households, children count before the son-in-law, on this auspicious sixth day. Those houses have their priorities right, methinks. 

Take our household, for instance. Growing up in a semi-joint family, Shoshthi was a grand summer affair. Typically occurring in the middle of summer vacations, we'd look forward to D day with anticipation and excitement. New clothes would be bought for the kids (and the sons and daughters and their spouses too) and we'd spend agonizing hours on colour-coordinating outfits for our entire band of cousins. 

And this is how it would unfold.

The night before. We gather, wash and trim bunches of kathal pata and Mami soaks a bowlful of kauner chal. Karamcha, dubbo and kacha holud grace the top of the large sideboard, along with spools of new thread and taalpatar pakha. Mama returns from Gariahat Market with large Ilish, mangoes, lichu and kalojaam. Gourda gets doi and mishti from Jadav Das. Baba brings the fattiest mutton from Monohor Pukur Road. And we set alarms to wake up early and catch the "Mother Dairy" dudhwala to buy extra packets of milk for kheer. The dried-milk version, not North Indian payesh.

Day of. Ma Mami Didu shower and collect some chul-dhowa jol in bowls, and make little putli of durba, karamcha and dhaan. And then get busy in the kitchen, making mowa, kheer and narkel naru.  We quick-shower, wear our new clothes, and assist in the cutting and peeling of fruits (in the process, eating a few lichus and kalojaams here and there). Mami then makes a Ma Shoshthi idol with moyda/chaler guro paste, and paint eyes and nose and mouth and hair and a red tip. We make a dozen of her chhanapona idols, and giggle on their ungodlike appearance. Oh and of course the cat-idol is made with great care too, complete with a curled tail and stiff whiskers. Now Mami sits Ma Shoshthi down on a piri, puts her children and her cat around her, and sticks a kathaler daal as background, to make things sylvan. 

Pilsuj-prodeep, shonkho, ghonta and other paraphernalia are brought down from Thakurghor to tintolar boroghor; chondon paste is made, flowers overflow from the big copper pushpo patro, and wisps of dhup-smoke carry that special pujo-fragrance to every part of the house. 

The pujo is the least time-consuming action of this day. More time is spent on prepping cotton thread with holud, and durba, arranging noibidyo and making today's piece de resistance - bana. What is a bana? Take a kathalpata, trim its top and bottom end, put a little bit of everything on it (aam lichu kalojam doi kheer mishti kauner chal) and voila! you have a bana! They come in two versions - with kathal, and without kathal. And you have to eat the whole thing at one go. No, not the leaf, but the contents of the leaf. The taste? Hamin ast!

So we arrange the stacks of bana, light more dhup, make a lot of noise with kashorghonta and shonkho, then sit ourselves down in a semi circle, and Mami starts to recite pNachali. After the littany, Didu fans her children with her special haatpakha, and sprinkles water on their heads with the koromcha-dhaan putli (which has a long tuft of  durba for this express purpose) then we present our collective heads to be fanned and sprinkled with water as well. (Gullu, Pingu are not exempt). Ma, Mami, Didu chant " katlo katlo mashir sari, tobu boli shaat shaat, katlo katlo pishir naak tobu boli shaat shaat " thus letting us know that today is the day of permissiveness, today we can do no sin. Of course, being good kids, we never put that to test.

After the fanning and the chanting, yellow threads are tied on our wrists, and we let Ma Shoshthi enjoy the fruit and sweet fare for all of 15 minutes. Then, competition on who can eat the most "bana" heats up, so much so that we have to make some extra ones for everyone else.

Lunch is served to the sons-in-law and the kids first. Pachta bhaja, neem begun, shaak, daal, shukto, shorshe ilish, mangsho, koromcha chatni, doi, and proshaad is eaten with much slurping, and almost always, the afternoon sees bunches of rainclouds gathering eastward, thus making post-lunch adda so much better. 

Evening brings a snack of muri and peyaji, and then leftovers for dinner. We step back into the mundane, but not before counting out the days until Rathjatra, then Rakhipurnima, then Bishwakarma pujo...

Ours is a culture of Parboni. One more than the number of months there is.





April 14, 2013

নিবিড় অন্তরতর বসন্ত এলো প্রাণে

মাস ফেব্রুয়ারী, তারিখ দোসরা। মায়ামীর মনোরম বাতাসে বসন্ত পঞ্চমের  ছোঁয়া লেগেছে, শিউলিগাছটা  অকারণে ফুল বিলোচ্ছে, গিরগিটি লাল গলা ফুলিয়ে গিরগিটিনীকে পটাচ্ছে।

গড়িমসি করে ঘুম থেকে উঠে আবার একটু রেস্ট করছি,  আর ভাবছি ডাম্বলডোর কেন ফিনফিনে পাতলা জোব্বা পরেছে, আর তলায় সুপারম্যানসম নীল ইয়ে, আর এর মধ্যে গ্যানডল্ফ কেন কালো, আর আমি এইরকম খাপছাড়া স্বপ্নই বা দেখি কেন। বেলা হয়েছে ঢের; প্রদীপ্ত চুল-চাঁচা-যন্ত্র দিয়ে কদম ছাঁট দিছে, বাইরে মুখোশ পরা লোকজন ঘাস কাটছে, ফোনে ফাবিওলার অধরা ডাক।

এমন দিনে রেস্টুরেন্টে খেতে হয়।

সে অবশ্য আমরা বাইরে বেশ ঘন ঘনই খাই, নানা কারণে  যেমন - আহ আজ কি দারুন হাওয়া দিচ্ছে, বাইরে খাওয়া যাক। অথবা, বাবা আজ কি টায়ার্ড লাগছে, চল বাইরে খাই। কিম্বা, কাঁচা বাজারের যা দাম, তার চেয়ে বাইরে খেলেই তো হয় - এই সব নানা অজুহাতে আমরা পান্ডা এক্সপ্রেস / লাজীজ / উদিপী ইত্যাদি দোকানদের উন্নতিসাধন করে থাকি। আজও তাই উইকেন্ড উদযাপন করতে আমরা বেরিয়ে পড়লাম, কোকোনাট গ্রোভের উদ্দেশে।

কফি ডিমেরপোচ আলুভাজা ফ্রেঞ্চটোস্ট (তাতে আবার চিনি আর কলার টুকরো দেয়া, সেগুলো সযতনে পরিহার করা হয়)  ইত্যাদি উপাদেয় ব্রাঞ্চ খেয়ে ভার্চুয়াল খড়কে-কাঠি চিবোতে চিবোতে আমরা এদিক ওদিক হাঁটতে  বেরোলাম - অবচেতন মনের ব্যাপার, পা চলে গেল Petco র দিকে। আরো গভীর অবচেতন - সেদিন ওখানে adoption আছে। যাক গে, সেসব তো পরে "what-if " করে দেখা হলো, আপাতত আমরা এগিয়ে চললাম।

কাছে আসতেই "ম্যাও ম্যাও ম্যাও বকম বকম ভৌ ভৌ ভৌ  চিহী" - আমি বললাম " একি, এটা তো Petco! আচ্ছা চল একটু দেখে আসি কি ঘটছে, আর মুসের জন্যে একটা খেলনা নিয়ে যাই" - মুস পড়শীর ৭০ কেজি গ্রেটডেন , আমি তাকে বেবিসিট করি রোজ। 

ঢুকলাম ভেতরে।মেঝের ওপর ছোটো ছোটো জালের বেড়া, তার ভেতরে পুতুল পুতুল চেহারার  ভুলুয়া আর পুষিরা শুয়েবসে আছে, আর চারদিক ঘিরে মানুষ-ছানারা কলরব করছে। বর্ণে গন্ধে শব্দে একেবারে ঘটনার ঘনঘটা। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, এমন সময় চোখ পড়ল একটা সাদা তুলোর বলের ওপর। গুটলি পাকিয়ে শুয়ে আছে, দেড় বিঘত সাইজ হবে। কাছে যেতেই গুটলির ভেতর থেকে একটা মাথা বেরোলো। তাতে জলদস্যুর মতন কালো চোখ-পট্টি, দুটো নীল চোখ মিটমিট করছে, আর একটুখানি গোলাপী জিব কচি দাঁতের ভেতর থেকে উঁকি দিছে। 

শরদিন্দুর শরণ নিয়ে বলতে হয় - মনে হইল সম্মুখের পৃথিবীটা একটুখানি সরিয়া গিয়াছিল, এখন খাপে খাপে মিলিয়া গেল।

"বিংগো" এলো ঘরে। 

January 21, 2013

সূর্য উনুন ওরফে ঝটিকা সফর - ৫


এটা গতবারের কথা - সেই যে সাড়ে সাত দিনের জন্যে কলকাতা গেলাম, সেই বারের। নানা মজারু ঘটনা চলেই থাকে, সেসব আগে বলেছি, এটা ভুলে গেছিলাম। অতএব...

বিদেশে ফেরার আগের দিনের কথা, শুক্রবার। রাত্রে মা আমি বনি খেতে বসেছি, পিঙ্গু লেজ এলিয়ে হাসিমুখে টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। তখন ওই রান্নার গ্যাস নিয়ে নানা ঝামেলা শুরু হয়েছে, ৯/৬ কেস।

খেতে খেতে মা খুব চিন্তান্বিত হয়ে বলল " এবার থেকে মাইক্রোওয়েভ বেশি বেশি ব্যবহার করব।"

আমি খুশি হয়ে - " এই তো, কম তেলে রান্না, মাইক্রোওয়েভ, এ সব খুব ভালো, শরীর ভালো থাকে"

মা রেগে গিয়ে - " কম তেলের কথা হচ্ছে না, গ্যাস সিলিন্ডার ৬টা মাত্র দেবে জানিস না? কোন দেশে যে থাকিস? "

বনি - " দিদিভাই আমেরিকায় থাকে মা, তুমি ভুলে গেছ? "

মা পাত্তা না দিয়ে গজগজ করতে থাকল - " এতগুলো লোকের রান্না গ্যাসে, দুদিনেই তো ফুরিয়ে যাবে। তারপর আবার সুমিত্রা তোয়ালে বালিশের ঢাকা সব সোডা দিয়ে গরম জলে ফোটায়..."

আমি - " ওগুলো তাহলে মাইক্রোওয়েভ এ দিয়ে দিও, একদম ফটফটে সাদা হয়ে যাবে..."

মা - " ইয়ার্কি মারিস না, তুই তো রান্না করিস ঘোড়ার ডিম, তুই কি বুঝবি একটা এতবড় সংসার চালাতে কত চিন্তা করতে হয়..."

বনি - " মা তুমি একটা সোলার কুকার কেনো। সক্কালবেলা সুনীতা ছাদে ভাত ডাল ডিম সব সেদ্দ করতে দিয়ে আসবে, দুপুরের মধ্যে সব ফিনিশ..."

আমি - " অথবা তিন চারটে সোলার কুকার নিয়ে মা সুনীতা সুমিত্রাদি শম্পা সবাই বিবেকানন্দ পার্কে গিয়ে লাইন দিয়ে বসিয়ে রাখবে, একটা কাকতাড়ুয়া সেট করে পাশে..."

বনি - " আর যেদিন যেদিন মেঘ করবে, সেদিন সবার উপোষ। আর বর্ষাকালটা তো মুড়ি খেয়েই কাটাতে হবে, এক দেড় মাস সূর্য উঠবেনা, সোলার কুকারো চলবে না...তখন বরং আমরা হাতারি থেকে খাবার আনাব, কি বল দিদিভাই? "

সেদিন রাত্রে মাকে আর ফারদার ঘাঁটাই নি :) 

October 3, 2012

গাড়ল গরু


টেক্সাসের আদিগন্ত বিস্তৃতি। ফিরোজা নীল আকাশের বাটিতে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই, সোনালি গমের খেত পেকে ঝমঝম করছে। মাঝখান দিয়ে সরু ফিতের মতো সোজা কালো রাস্তা। খেতের সীমানার অন্তে সবুজ রমালের মত টুকরো নরম মাঠ, তার চারধারে সাদা বেড়া। ইতস্ততঃ গরু চরছে, বিখ্যাত "লংহর্ন"

"নেসি" - মধ্যরাত্রিনীল নিসান - বনেটে দুপুরের রোদ্দুর ঝলসিয়ে গড়গড়িয়ে চলেছে। ভেতরে স্বয়ং আমি আর ল্যাংবোট। ভাতঘুমে গাড়ি চালাচ্ছি, একটা ঝিমধরা ব্যাপার।

ল্যাং - কত্ত গরু! হ্যামবার্গার খাব!
আমি - এই তো খেয়ে বেরোলি!
ল্যাং - গরু দেখলেই আমার খিদে পায়।
আমি - তুই নরকে যাবি!
ল্যাং - নাহ, ওটা কলকাতায় খেলে হয়, এখানে অন্য সিস্টেম।
আমি - তোর মতো চোখের-খিদে জনতার জন্যে একটা করে মেশিন দরকার। বড় একটা বাক্স টাইপ। গরু অন্দর, বার্গার বাহার। একদিক দিয়ে গরু ঢুকবে, অন্যদিকে পটাপট বার্গার বেরবে। পাশ দিয়ে শিং খুর ল্যাজ একটা ব্যাগে জমা হবে, আর গ্যালগ্যাল করে রক্ত বেরিয়ে একটা বালতিতে পড়বে।
ল্যাং - ওয়াক ওয়াক। ঠিক আছে, ম্যাকনাগেট খাই তাহলে। গাড়ল গরু সব। আর ঘোড়া তো খাওয়া যায় না। ঘোড়েল ঘোড়া।
আমি - তোর বাংলায় ব্যুৎপত্তি দেখে আমি স্তম্ভিত।
ল্যাং - স্তম্ভিত মানে যেন কি? খুশি হওয়া, না?

আধঘণ্টা পর -দেখছি কোথায় কফি পাওয়া যায়। ল্যাংবোট ঘুমিয়ে পড়েছিল,গাড়ি থামতেই চমকে উঠে বসল (এটা ইংরিজিতে লিখতে হবে) কি হয়েছে? Are you pheeling hejji? And a litil diji?
আমি কিছু হয় নি, কফি কিনব।
ল্যাং তাই বল। আমি ভাবলাম you are going creji, মাঠের মধ্যে গাড়ি থামিয়ে তেল খুঁজবি হয়তো।

আজেবাজে কথা পাত্তা দিলাম না। কফি নিয়ে আবার গড়গড়।

There ij a cool breej on the briz.  ল্যাং ছোট্ট কমেন্ট হাওয়ায় ভাসিয়ে  গুটিসুটি মেরে ঘুমোনোর তোড়জোড় করতে লাগলো। ধারেপাশে যদিও ব্রিজের ব ছিল না।

(জুন, ২০০৮)

October 1, 2012

দিন দুপুরে ...

(বড়মাসি অস্ট্রেলিয়াতে ৪০ বছর কাটিয়ে সদ্য কলকাতা ফিরেছে)

দুপুরবেলা, তীব্র গরম পড়েছে। ফুলস্পিডে পাখা চালিয়ে দিদু আর বড়মাসি খেতে বসেছে। গৌরদা (দিদুর বাজার সরকার/লোকালগার্জেন/অ্যাসিস্ট্যান্ট) পরিবেশন করছে - মুসুর ডাল, আলু-কুমড়ো-সেদ্ধ-নুন-তেল, ভাত, বড়ি দিয়ে মাছের ঝোল, কাঁচা আমের চাটনি, টক দই।

বড়মাসি বেশ আনন্দে আছে। মিনারেলজল খাচ্ছে না, রেগুলার বাইরে খেয়েও পৈটিক গোলযোগ হয় নি, কলকাতার গরম তাকে কাবু করতে পারে নি। জাহাজে তার অনেক জিনিস আসছে, তার মধ্যে দুটো টেনিস র‍্যাকেট, একটা পাউরুটি-মেশিন আর একটা খাতার কথা আমরা সমানে শুনছি। "সেইবার আমরা ক্রুজে গিয়ে একটা কি দারুণ জিনিস দেখলাম জানিস তো, লাল মত, পেটের কাছটা নীল...দাঁড়া, আমার খাতা আসছে, ওতে সব লেখা আছে" কিম্বা "চাইনিজ রাজকন্যাগুলো কি সুন্দর! সিল্কের ওপর সিল্ক পরেই যাচ্ছে পরেই যাচ্ছে, কোমরে এই মোটা সোনার বেল্ট তাতে নানারকম জেড আর রুবি বসান...ছবিটা আমার খাতায় আছে..."

যাই হোক, দুপুরবেলা বড়ঘরের খাবার টেবিল।

গৌরদা বড়মাসির থালায় ডাল দিতে দিতে বলল "বাড়িটা তো চিড়িয়াখানা বানিয়েছেন ভাল। দুটো গিধনি পাখি নিয়ে আসুন এবার, পায়ে দড়ি বেঁধে দেবেন, ছাদে উড়ে বেড়াবে।"
বড়মাসি উৎসাহিত "গিধনি পাখি কিরে? হাতিবাগানে পাওয়া যায়?"
গৌরদা  সবজান্তা হেসে "কি যে বলেন! ওকি পোষা পাখি? ও থাকে পাহাড় চুড়ায়, জোড়া বেঁধে। একা ওরা বাঁচেনা, আর ধরলেও বাঁচেনা"
বড়মাসি বিভ্রান্ত "এই যে বললি পুষতে? ঠাট্টা করলি বুঝি?"
গৌরদা ক্ষুণ্ণ "না না! আমরা দেশের বাড়িতে ওদের ডাক শুনেছি, এই বড় বড় পাখি! যে সাপের মাথায় মানিক থাকে, সেই সাপ খায় ওরা। সাপের মাথার মানিক জানেন তো? নাকি অশটেলিয়াতে থেকে সব ভুলে গেছেন?
বড়মাসি উত্তেজিত "সাপের মাথায় মানিক? কই আমি দেখিনি তো? সিডনি জুতে অবশ্য সাপের দিকটা আমি বেশি যেতাম না - ওগুলো বড্ড কিরম যেন লাগে - কিন্ত নিকিকে বলতে হবে, ওর এসব হিস্ট্রি জানা দরকার!" (নিকি বড়মাসির নাতি)
গৌরদা খুশি হয়ে "হ্যাঁ, আমি তাই বলছি! সাপ মাথার মানিক রেখে সেই আলোতে পাখিটাখি ধরে খায়। আর গিধনি সেই সাপ খুঁজে বার করে, আর যাদের পোষা হয়, তারা বড়লোক হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশের রাজাগজারা খুব বদমাশ, সব মানিকটানিক ওরাই নিয়ে নেয়, গিধনির মালিক কিছু পায় না। গরিবমানুষের কত কষ্ট বলুন। আর এই যে ভোট আসছে, আবার একগাদা মানুষ মরবে, রাজারা আরো বড়লোক হবে। সাধে কি দেশটা সাহেবরা ... "

ফোঁস করে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে গৌরদা রান্নাঘরে দই আনতে গেল।

বড়মাসি এদিকে মহা চিন্তায় পড়েছে, নিকিকে না জানানো অব্দি শান্তি নেই। " এইসব ফোকটেলের কিছু বই আনিস তো, পম্পি? নিককে পাঠাতে হবে। ও খুব ভালবাসে বই পড়তে, ওর বারো বছর হলে বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসবে বলেছে, আমাদের এই বাড়িটা ওর দারুণ পছন্দ। কিন্তু...আমি কোনোদিন গিধনি পাখি... আচ্ছা গৌর ইয়ার্কি মারছে, না? "

দিদু এতক্ষণ এই আষাঢ়ে কথোপকথনে পাত্তা না দিয়ে  মনোযোগসহকারে মিলিকে আমের চাটনি খাওয়াচ্ছিল, হঠাৎ খেয়াল করল বড়মাসি শুকনো হাতে বসে আছে। "রাণু? বসে আছ কেন? পেট ভরেনি বুঝি? আরেকটু চমচম খা। আর ওইসব সাপটাপ আমার ভাল লাগে না, গৌরকে মারব আমি, আজেবাজে কথা বলে মাথা  ধরিয়ে দিল। গৌর? রানুকে চমচম দিয়ে দই দে, আর একটা কথাও বলবি না। যা তুই খেতে বস। রানু, যাও হাত ধুয়ে একটু শুয়ে নাও, অনেক বেলা হল।"

চুরাশি-বছুরে মায়ের আদেশে পঁয়ষট্টি-বছুরে মেয়ে চটপট উঠে হাতমুখ ধুয়ে নাকে চশমা এঁটে সটান ডিভানে শুয়ে "Silk Route" এর পাতায় মগ্ন হয়ে পড়ল। 


(২০০৫, এপ্রিল মাস)

র‍্যান্ডম একদিন

আমার বোন/ধু "চি" মাসছয়েক আমাদের কাছে ছিল, গত বছর। 

এমনিতে ও প্যাঁচা প্যাটার্ন, রাত্রে জেগে থাকে দিনে ঘুমোয়। কাজেই, আমরা যখন আপিস কাছারি শেষ করে রাম-টায়ার্ড অবস্থায়ে টিভির সামনে জিরোতে বসি, তখন ওর রাজ্যের এনার্জিতে ফুটকড়াই অবস্থা। এই আলু-ফুলকপি রান্না করে ফেলছে, এই চেলো কাবাব বানাচ্ছে, এই গাদা কাপড় ধুয়ে শুকিয়ে মায় ভাঁজ পর্যন্ত করে ফেলছে - অভ্যেস এমন খারাপ করে দিল যে ও ফিরে যাওয়ার পর ওই ভাঁজ করা কাপড়ের লোভে বাড়ির সামনে কিউবান ধোপাকে কাপড় দেওয়া শুরু করলাম - যদিও তার নাম জাফর। আর রান্নাঘরে মশলার তাকে এলাচ-লবঙ্গ-দারচিনি-লঙ্কা-হলুদ-তেজপাতা-জিরে ছাড়া যে এক গন্ডা কৌটো আছে, সেগুলো আমি চিনিও না, ব্যবহারও করি না।

সে যাক গে। এমনি একদিন, খুব বৃষ্টি পড়ছে। 

বৃষ্টি পড়লে মনটা যুগপৎ ভালও হয়, খারাপও হয়। সেই দোলাচলে মুড়ি পেঁয়াজি চা ব্যাপারটা জমবে ভালো। এদিকে সূর্য আজ ওঠেনি বলেই বোধহয় - ডাক্তারবাবু সন্ধ্যের মুখে বাড়ি চলে এসেছেন। পেঁয়াজ ব্যাসন লঙ্কা নুন গুলে, চা বানিয়ে, "চি" কে ডাকতে গেলাম। 

আমি - উঠে পড় উঠে পড়, সন্ধ্যে হয়ে গেছে।
"চি"  সোফাতে ঘুমন্ত।
আমি - কিরে, উঠবি না?
"চি" তাও ঘুমন্ত।
আমি মৃদু ঠেলা দিয়ে - এই, ওঠ!
"চি" মাছি মারার মতো করে আমার হাতে এক চাপড়
আমি - আহ! মারছিস কেন? 
"চি" ঘুমন্ত অবস্থায় - মজা 
আমি - মজা? বার করছি তোর মজা (কাতুকুতু দেওন)
"চি" - উঁ উঁ ...বলছি আমি কাজটা শেষ করেই আসছি 
আমি - এখনি ওঠ, এক্ষুনি 
"চি" - বাড়ি চলে গেছে
আমি - কেউ বাড়ি যায় নি, পেঁয়াজি বানাচ্ছি খাবি চল 
("চি" হাঁ করে অপেক্ষা করন )
আমি - এখানে দেব না, খাবার টেবিলে চল 
"চি" পাশ ফিরে - আচ্ছা, কাল যাব।

সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না দেখে, ঘরের সব আলো জ্বেলে জোরসে এক ঠেলা মারলাম - আধখানা লাল চোখ খুলে গেল - সকাল হয়ে গেছে?
আমি ঘটঘট করে জানলা বন্ধ করতে করতে - সকাল সেই সকালে হয়েছিল, এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে, আর তুই আমাকে মেরেছিস।
"চি" ভোম্বল অবস্থায় - মেরেছি? কেন? 
আমি ভিকটিম মুখে - কেন আমি কি জানি? আমি তোকে পেঁয়াজি খেতে ডাকতে এলাম ..." 
"চি" করুণমুখে - ইস সরি সরি। ঘুমের মধ্যে আমি বুঝতেই পারি না ..." 

এর পর আমায় পেঁয়াজিও ভাজতে হলো না, চাও করতে হলো না। রাত্রে উত্কৃষ্ট খিচুড়ি রান্না হলো, সাথে ডিমভাজা আর পাঁপড়।

এখন বৃষ্টি পড়লে ম্যাগি বানাই আর ডাক্তারবাবু হা-হুতাশ করেন।

(জুলাই, ২০১১)

এতদ্দ্বারা "চি" কে সত্বর ফিরিয়া আসিতে অনুরোধ করা হইতেছে 

September 30, 2012

ঝটিকা সফর - ৪


সোমবার থেকে পুরোদস্তুর অফিস সুরু, তার আগে চট করে Select Stores যাব। গড়িয়াহাটার মোড়, মিনিমিনি বাসবাস, সঙ্গে ল্যাংবোট চিঙ্কি। সিমুর বিয়ে, কাঁথাস্টিচের শাড়ি কেনার প্ল্যান ময়ূরকণ্ঠী রঙের।
দোকানে গিয়ে  যদিও এই 'স্পেক' দিয়ে বলেছি শাড়ি দেখান, কোন এক অজ্ঞাত কারণে যে শাড়িগুলো দেখানো হতে লাগলো, সেগুলো না কাঁথাস্টিচ, না ময়ূরকণ্ঠী। সঙ্গে ম্যাজিশিয়ানের প্যাটার - "এইটা দেখুন, অনবদ্য কালার, অসাধারণ কাজ, এই এক পিসই পড়ে আছে"...অথবা  "এটা এই পুজোয় লেটেস্ট ফ্যাশন, কন্ট্রাস্ট দেখেছেন?" এর মধ্যে চা এসে গেছে এক রাউন্ড "আরেক কাপ চা দি, দিদিভাই?"

আমরা বৃথা তর্ক না করে বসে বসে গোটা পনেরো বিভিন্ন রং-রকম-দামের শাড়ি দেখে, একটাও পছন্দ না করে উঠি উঠি করছি "চল ওদিকটা যাই, ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি..." শাড়িকাকু মিনতি করলেন "দিদিভাই, এক মিনিট, আরেকটা জিনিস দেখে যান।" তারপর গলা খাদে করে রহস্যময় ভাবে ডাকাডাকি করলেন "মদনা - ভেতর থেকে ওই মালটা বার কর তো, যেটা পেশাল অর্ডারি" আবার পাঁচটা শাড়ি এসে পড়ল, এগুলো সুন্দর দেখতে কিন্তু একটাও কাঁথাকাজের না। যাই হোক, ধৈর্য শেষ, খিদে পেয়েছে, বাজখাঁই নামের বেশ জমকালো শাড়ি কিনে বাড়িমুখো হলাম।

এসে দেখি মা ওষুধের প্যাঁটরা খুলে বসেছে। এই প্যাঁটরাটা আমার, প্রতিবার রিফিল করা হয়, চেনা ওষুধ সঙ্গে থাকলে মনে বল পাই। মা এক একটা পাতা দেখছে আর আঁতকে আঁতকে উঠছে -
(মা) এমা, এটা তো ডেট এক্সপায়ার করে গেছে, ছিঃ ছিঃ এত্তগুলো ক্রোসিন... এহহে, র‍্যানট্যাকগুলো গলে গেছে তো..আচ্ছা আগেরবার যে ব্যাকট্রিম দিলাম, সেগুলো খাস নি?
(আমি) কি আশ্চর্য মা, দরকার না হলে খাব কেন? আমি অত ওষুধ খাওয়া পছন্দ করি না, গাদা গাদা অ্যান্টি বায়োটিক খেয়ে সব রেসিস্টেন্ট...
(মা) রেখে গেলেই পারতিস, আমরা খেয়ে নিতাম।
(আমি) খেয়ে নিতে? এটা আচার না মশলা যে অকারণে খেয়ে নিতে?
(মা) আহ আমি না খেলেও, এই ধর ববিতার কদিন আগে পেট খারাপ হল, তারপর চন্দ্রদীপের গ্যাস্ট্রাইটিস...(ববিতা গলি-সিঁড়ি-ছাদ ঝাঁট দেয়, চন্দ্রদীপ হোল ধোপা)

বাকরুদ্ধ হয়ে চান করতে গেলাম।

বর্ষার দুপুর - লুচি আলুরদম চাটনি খেয়ে, পিঙ্গুকে পান খাইয়ে, ল্যাপটপ বার করে ইমেল দেখব। তখনি কবি কাঁদলেন, অর্থাৎ ক্রোম বলল কানেকশান নেই। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। নতুন কাজ, বসকে বলে এসেছি কোওনো ব্যাপাআআর না, কলকাতা থেকে হইহই করে আপিস করতে পারব...এতো মহা গেরো! বিমর্ষ হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি - ওমা, দেখি আউটলুকে বানের জলের মতো ইমেল আসছে! ইদিকে কোনো ওয়েবপেজ খুলছে না - যাকগে যাক, জয় বাবা ফেলুনাথ, এযাত্রা চাকরিটা বজায় রইল। নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে গেলাম - যাকে বলে ন্যাপ - আবার ৬টার মধ্যে উঠে পড়তে হবে।

বেখাপ্পা সময় কাজ - সন্ধ্যে ৭টা থেকে রাত্তির ৩টে। কিন্তু ঘনঘন কমিক-রিলিফ-ব্রেক, মিটিঙের ফাঁকে দরজা দিয়ে পিঙ্গুর উঁকি, মায়ের মাইম করে জিজ্ঞেস করা কতক্ষণ পরে খেতে বসতে পারব - এসব যখন দাঁড়িপাল্লার এদিকে বসাই, সময়ের বিদঘুটেপন তুশ্চু হয়ে যায়। আর, "কাঠে টোকা দিয়ে" আমার নতুন বসটা একটু পাগলী হলেও মানুষ ভাল, এই সপ্তাহে খটোমটো কিছু শিডিউল করেনি।

শুরু হল সোমবারের মিটিং টিটিং। 


September 27, 2012

ঝটিকা সফর - ৩


আমি আবার একটু hypochondriac আছি, যেটাকে মা বলে ভ্যানতাড়া আর প্রদীপ্ত বলে Munchausen Syndrome। রোববার সকালে যেন শুনলাম মশার পিনপিন শব্দ, তিড়িং করে ঘুম পালিয়ে গেল। খবর কাগজ চা বিস্কুট টেবিলে গুছিয়ে পা গুটিয়ে বসলাম, কিন্তু পায়ে কুটকুট করছিল।

মা গম্ভীরসে বলল "আমাদের বাড়ির মশায় ডেঙ্গু হয় না, ওরা আমগাছের মশা"। তারপর স্বপক্ষসমর্থনে শম্পা, সুনীতা, সুমিত্রাদি সবাইকে সাক্ষী দেয়ালো "বল? তোদের মশা কামড়েছে কিনা? (মস্তকহেলন) ডেঙ্গু হয়েছে? কিছু হয়েছে? (মস্তকদোলন) ব্যাস কিছু হয় নি পায়ে, আর ধুনোর গন্ধে আমাদের asthma হয়"। তাও সিট্রোনেলা মোমবাতি জালিয়ে টেবিলের তলায় স্থাপন করলাম, পিঙ্গুর নাক বাঁচিয়ে।

খেলার পাতাটা পড়ছি, মামী এসে পড়ল "টুলুদি আমায় একটু চা পাতা দাও, দুধটাও জ্বলে গেছে" (মামী রেগুলার গ্যাসে দুধের কড়া বসিয়ে ব্যাঙ্কে যায়)
মামীকে বললাম "দেখেছ পোনোবদা এসেছে কলকাতায়, সবুজ কার্পেট পেতে দিদি ওয়েলকাম করেছে।"
মামী অবাক হয়ে বলল "সেকি, খরাজ আজকাল এখানে থাকে না?"
তারপর আমার ?? মুখ দেখে বলল " ভূতের ভবিষ্যৎ এর প্রমোদ প্রধানের কথা বলছিস তো? ওটা খরাজ ছিল, পল্টনের বন্ধু খরাজ রে।"
আমি মিহি করে বললাম "পোনোবদা মানে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখোপাধ্যায় মামী।"
"ও, দেখেছিস, মাথাটাই গেছে "

এই ফাঁকে বনিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোকে মশা কামড়েছে? অম্লানবদনে উত্তর এলো - হ্যাঁ, রোজ কামড়াচ্ছে, তোর ব্লাডগ্রুপটা জানিয়ে রাখ। শুনেটুনে চারদিকে RAID স্প্রে করলাম। মহা ঝঞ্ঝাট তো!

চিন্তিত ভাবে Mocambo পৌঁছলাম, সেখানে অভিষেক সপ্তদ্বীপা এলিনা দেবজ্যোতি ঋষিরাজ দীপাঞ্জনের সাথে লাঞ্চাড্ডা। একজন ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করা হল মশা তাড়ানো কয়েল আছে কিনা, তারপর ভাগ্যিস পা গুটিয়ে বসেছিলাম, কারণ কাদের কাদের যেন কামড়াল। এদিকে অভিষেক "ঘৃণা লজ্জা ভয় তিন থাকতে নয়" পলিসিতে এদিক ওদিক টেবিলের দিকে আঙুল দেখিয়ে ওয়েটারদের জিজ্ঞেস করছে "আচ্ছা ওরা কি খাচ্ছে? ওটা কি বলুন তো? ওই ওরা যেটা খাচ্ছে, সেটা দু প্লেট দেবেন। দাঁড়ান দাঁড়ান, এটা কি নিয়ে যাচ্ছেন, বেশ দেখতে - এটাও দু প্লেট দেবেন।" 

এর মধ্যে সামনের টেবিলে তিনজন এসে বসলেন, ভদ্রলোকের বয়েস হবে ষাটের কোঠায়, এক মহিলা পঞ্চাশের আশেপাশে, অন্য মেয়েটি হয়তো ত্রিশ। অত্যন্ত অবান্তর গেসিং গেম শুরু হোল - আচ্ছা উনি কি পাত্রী দেখতে এসেছেন? কোনজন পাত্রী? নাকি অনলাইন আলাপ, আজ প্রথম দেখা, গার্ড দেওয়ার জন্যে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন? নাকি বিছড়া হুয়া পুরনো প্রেম? মুখের অভিব্যাক্তি দেখছিস? এটা পুরনো আলাপ হতেই পারে না.. আমরা খুব ইনভল্ভড হয়ে পড়লাম। গলার আওয়াজ কারুরই কম না, পাশের টেবিলের ছেলেটা আমাদের কথোপকথনে উসখুস করছিল, হঠাৎ সপ্তদ্বীপা তার পায়ের কাছে গড় হয়ে "ব্যাগটা পড়ে গেছে দেখি একটু" বলায় বেজায় খচে গেল। 

এত কিছুর পরেও আমরা লোকলজ্জা ত্যাগ করে নানা উপাদেয় খাদ্যাদি সাঁটিয়ে প্রভূত আড্ডা মেরে বাড়িমুখো হলাম। চকোলেট দেবজ্যোতি আর ঋষিরাজ ভাগ করে নিল, ৮০-৪০ ওজন অনুপাতে।

সন্ধ্যেকাল। বেকবাগানে কাকিমার জন্মদিনের নেমন্তন্ন। সেজেগুজে পৌঁছে গেছি, কাবাব খেতে খেতে কাকিমা ঋতশ্রী মামী মা বনি সবাইকে আমার বুটক্যাম্পের গল্প শোনাচ্ছি - এই করতে হয়, ওই করতে হয়, পুশআপ, স্কিপিং, "দেখেছ আমার কি মাসল হয়েছে হাতে?" (বনি পাঞ্জা লড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল...মাথা খারাপ নাকি, তারপর ভাঙা হাত নিয়ে ফিরতে হবে) এই সব কথা হচ্ছে আর সব্বাই অকারণে হাসছি। মামীও খুব হেসে বলল " হ্যাঁ, ঠিক মেরী ডট কমের মত "।

ইফ কম ইজ হিয়ার, ক্যান ডট বি ফার বিহাইন্ড?

দারুণ দারুণ সব রান্না হয়েছিল, খেয়ে দেয়ে বাড়ি এসে ভাইকিংকে ফোনে বিস্তারিত বিবরণ শোনালাম। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল " যা তোরাই তাহলে আনন্দ কর "

আর ও ব্যাটা যে পুজোর কলকাতায় এসে আনন্দ করবে? তার বেলা?

ঝটিকা সফর - ২


পরের দিন সক্কালবেলা পিঙ্গু বিস্কুট নিয়ে এসে ডাকাডাকি করতে লাগলো, ও খাবে আর আমাদের দেখতে হবে। সেই দেখে আমার বিস্কুটখিদে পেল। চা - bourbon cream খেয়ে  শাবানার কাছে যাব - হেনা লাগিয়ে দেবে, মুখে গুঁড়ো গুঁড়ো কীসব লাগিয়ে মেজে দেবে ইত্যাদি - এর মধ্যে কাকিমার বার্তা, আমার জন্যে "এই একটু" গলদা চিংড়ির মালাইকারি আর নকুড়ের মিষ্টি পাঠাচ্ছেন :) তারপর কাল সন্ধেবেলা নেমন্তন্ন, দুপুরে Mocambo তে ক্যুইজ-বন্ধুদের সাথে খাওয়া দাওয়া - খুব প্যাকড প্রোগ্রাম।

মা সখেদে আপত্তি করছে - এই শুরু হোল টো টো করা - বাড়ি এসে একটু রেস্ট করবি তা নয়...(আমি) মা, আমি মায়ামিতে সারাদিন রেস্ট করি, এখানে এসে একটু ঘুরতেও দেবে না? তুমি কি চাও না আমি আনন্দ করি? (মা) যা ইচ্ছে কর আমি আর কিছু বলছি, দুপুরে কি খাবি? (আমি) আবার খাওয়া? ওফফ যা আছে তাই খাব, যা নেই তা কি করে খাব? (বনি) তোমরা প্লিজ বাইরে গিয়ে ঝগড়া করবে? আমি একটু ঘুমোচ্ছি।

এর মধ্যে Emirates ফোন করে প্রভূত ক্ষমা চেয়ে জানাল সুটকেস বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে। ডিলা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস বলতে বলতে হেনারঞ্জিত মাথা নিয়ে বাড়ি এলাম, দুঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলতে হবে। পিঙ্গু এসে ব্যাপারটা দেখেশুঁকে, এক রাউন্ড হেঁচে নিল। মালাইকারি এসে গেছে - অতি সামান্য, ১৫টি ইয়া সাইজের চিংড়ি। সঙ্গে অনবদ্য মাছের কাবাব আর মিষ্টি। খেয়ে, মাথা ধুয়ে, একটু আনন্দবাজারটা নিয়ে একটু গড়িয়ে নেব প্ল্যান, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। বৃষ্টি পড়ছে, ঘরের মধ্যে ঝিমঝিমে অন্ধকার, দিবানিদ্রার আর দোষ কি!

রাত্তিরে তানিয়া, সৌম্যদাদা সব এসে হাজির। আড্ডা মেরে পিঙ্গুর নাচ দেখে সুটকেস ব্যাগপত্র গুছোতে গেলাম। আমার আবার ভয়ানক geometric insecurity আছে, চারপাশটা ঠিকঠাক রাইটঅ্যাঙ্গেল প্যারালাল সেন্টার না হলে মাথায় কটকট করে। সুটকেসটা সোজা করে রেখে, পাশে সার সার করে হ্যান্ডলাগেজ, ল্যাপটপ ব্যাগ সব রেখেছিলাম। এখন দেখি সব ঘেঁটে গেছে। গজগজ করছি আর টেনে টেনে সমান করছি :
(আমি) মা সুমিত্রাদি কে বলবে জিনিস যেরম ছিল সেরম করে রাখতে সব হিজিবিজি করে দিয়েছে 
(মা) তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে? এই বৃষ্টির মধ্যে সুমিত্রা যে আসছে সেটাই অনেক, চারদিকে জ্বরজারি কত হচ্ছে জানিস? 
(আমি) তা এসে যখন পড়ছে, সোজা করে রাখলেই পারে 
(মা) আমি পারব না বলতে, একটা কাজের লোক পাওয়া যায় না তার মধ্যে সোজা উল্টো 
(আমি) ঠিক আছে, এই ঘর মুছতে হবে না কদিন থাক 
(মা) তারপর মশা দেখলে চিল চিৎকার করিস না যেন 
(আমি) ইয়ে...মশা? 
(মা) হ্যাঁ। কোন জগতে থাকিস? ডেঙ্গু হচ্ছে এখানে পড়িস নি? 
(আমি)ও বাবা, মুছুক তাহলে - ফিনাইল দিয়ে যেন মোছে আর ধুনো আছে নাকি, মা? 
(মা) ধুনো দরকার নেই, বাড়াবাড়ি কোরো না।

মশাতঙ্কে ঘুমোতে গেলাম, ওডোমস মেখে।

ঝটিকা সফর - ১


সাত দিনের জন্যে কলকাতা ঘুরে এলাম। মাথার মধ্যে প্ল্যানটা ঘুরপাক খাচ্ছিল কদিন ধরে, তারপর টিকিট করে প্রদীপ্তকে casually বললাম আমি কলকাতা যাচ্ছি (যেমন মাঝে মধ্যেই অস্টিন যাই, এমন একটা ভাব)। শুনে বিমর্ষ হয়ে ফুচকা খেতে মানা করল, কিন্তু কবে যাচ্ছি কবে ফিরছি সেসব আর জিজ্ঞেস করল না। আমিই ফড়ফড় করে বললাম এই দিন airport পৌঁছতে হবে এই দিন আনতে হবে ইত্যাদি। মা কে সারপ্রাইজ দেব, এই প্ল্যান।

মায়ামি থেকে নিউ ইয়র্ক হয়ে দুবাই পৌঁছে মাকে sms করলাম আমি একটা সেমিনারে খুব ব্যাস্ত আছি, ফোন করতে পারছি না। মা উত্তর দিল "ঠিক মত খেয়ে নিস"।
এই খাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে এত ইয়ে... যাকগে, কথা না বাড়িয়ে আমি চকোলেট কিনতে গেলাম।

কলকাতা পৌঁছে দেখি ফোনটা কাজ করছে না। বিরক্তিকর ব্যাপার, তারপর সুটকেসও আসছে না। ইতি উতি ঘুরছি আর ভাবছি কেন এত দেরি - হঠাৎ শুনি আমার নাম ঘোষণা করছে। (নিউ ইয়র্কেও গমগমে স্পিকারে বিকৃত উচ্চারণে আমাকে ডাকাডাকি করা হচ্ছিল, কারণ আরেকটু হলে প্লেন মিস করছিলাম)। তো স্যুটপরিহিত চিমসেপানা এক ছোকরা আমাকে সবিনয়ে জানাল যে আমার সুটকেস আসে নি। আমি যত বাংলা বলি সে তত ইংরিজি বলে। তারপর গুচ্ছের ফর্ম ধরিয়ে ভরতি করতে দেয়, যেন দোষটা আমারি। ঝাড়া আধ ঘণ্টা লাগলো সেই baggage report তৈরি করতে, তারপর তারা বড় সাহেবের কাছে সই করাতে গেল। আমি এর মধ্যে গটগট করে বেরিয়ে বনি /  ভোঁদুকে বলতে গেলাম কেন আমার দেরি হচ্ছে । ফেরার সময় পুলিশদাদা আটকাতে গিয়ে বেজায় ধমক খেল। খিদে পেয়েছে, ঘুম পেয়েছে, সুটকেস আসে নি, এই সময় ধাষ্টামো ?

বাড়ি পৌঁছে বনিদের একটু পেছনে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। মা গেট বন্ধ করতে যাচ্ছিল, আমাকে দেখে কির'ম যেন স্ট্যাচু হয়ে গেল। তারপর তড়বড় করে "একি? তুই এসেছিস? এরম তো কথা ছিল না? কি ব্যাপার? কি কাণ্ড! কি মজা!!" ইত্যাদি নানা সব বলতে লাগলো। তারপর পিঙ্গুকে অনেক আদর করল, বনির পিঠে হাত বোলাল, আর উত্তেজিত হয়ে এঘর ওঘর করতে লাগলো।

আমি এদিক ওদিক ওপর নিচ দৌড়ে সবাইকে জানিয়ে এলাম আমার আগমন বার্তা। চিরন্তন ফিতে হাতে মামী এসে হাজির, মামা ক্রসওয়ার্ড এর কাগজ শুদ্ধু উঠে এসেছে, পিঙ্গু নেচে কেঁদে একসা করছে, দিদু ঘুম থেকে উঠে পড়েছে -  বাড়িতে প্রচন্ড হট্টগোল শুরু হোল। তার মধ্যে মায়ের স্রোতের মত প্রশ্ন " গিজার চালাবো? কোথায় ঘুমোবি, তিনতলায় নাকি এখানে? চা খাবি? ইস কি কান্ড! কবে বেরিয়েছিস? সেমিনারটা গুল ছিল?? বনি সব জানত কিন্তু আমায় কিছু বলে নি? হিইইইইইই!! "

পিঙ্গু এদিকে দিশেহারা হয়ে একবার বড় খাট একবার ডিভান লাফ দিচ্ছিল, কোঁওওও কুঁউউঁউঁ নানারকম আওয়াজ করে। তারপর একদম velcro হয়ে গদগদ মুখ করে হাত/গলা/মুখ চেটেই চলল, আর ক্ষণে ক্ষণে handshake করল (পিঙ্গু ভয় পেলে, অথবা প্রচন্ড আনন্দিত হলে হাসি/কান্না মুখে handshake করে)। তারপর পেছন পেছন দৌড়তে লাগলো ওপর নিচ, আমার সঙ্গে বাথরুমেও ঢুকে গেছিল। মা যখন তাকে খাওয়াতে বসাল, মাঝে মাঝেই ঘাড় কাত করে দেখে নিচ্ছিল আমরা ঘরে আছি কিনা, একবার ঝোল-মাখা মুখে এসে ঢুঁসিয়ে গেল। সেদিন রাত্রে গরম লাগা সত্ত্বেও বড় খাটে আমাদের মধ্যে শুল, আর ঘুমের মধ্যে কিরম যেন সাঁতার কাটার মত করছিল। 

সুটকেস নেই, চানটান করে বনির পাজামা আর টি শার্ট পরে ফোন করলাম। "দিদি? আমি এসে গেছি, তুই কাল আয় শিগগির (তুই কি সত্যি পাগল পম, ডেলি প্যাসেঞ্জার নাকি?) ঝুম? হাহাহা ইয়েস আমি আবার চলে এসেছি (এটা তুইই পারিস...সোনামাসি কতায়? কতায়?) ভিক্স!! আরে এটা আমি - নতুন নম্বর কারন পুরনো সিমটা ভোঁদাফোন নারায়ণ করে দিয়েছে (তুই যে কেন ফেরত যাস সেটাই আমি বুঝি না...দিদিভাই এসেছ? ভেরি গুড - এটা বুবুন) তারপর প্রদীপ্ত কে একটা মেসেজ করে দিলাম, দিনের বেলা ফোনে কথা বলার সময় দেন না Dr. Rosenberg"...যাকে সবাই "Lion King" বলে ডাকে...

ওদিকে মা জনে জনে ফোন করে খবর দিচ্ছে - "ঠাকুরপো? কেমন আছ? হাঁটু ব্যথা কমেছে? মা ভাল আছেন...এই ত...আজ  কি হোল বল তো? একটু আগে মাম্পু এসে পৌঁছেছে। হ্যাঁ!! আমি তো কিছুই জানি না, তকাই বলল ইলিশ মাছের ঝোল করে রাখ আর কফি কাস্টার্ড, আমি ভেবেছি শনিবার বলে বোধয়...তারপর দেখি সিঁড়ি দিয়ে "হ্যালো মা" বলে উঠছে। আমি যে তখন কি করব কি বলব ভেবেই পাচ্ছি না...  মাথা গুলিয়ে গেছে...হ্যাঁ সাত দিন মাত্র সময়, রাত্তির জেগে অফিস করবে..."
"টুকা? কি করছিস? না এখন খাব কি, সবে এগারটা বাজল। আজ কি হয়েছে বল তো? একটু আগে মাম্পু এসে পৌঁছেছে......(বাকিটা আর লিখলাম না)
" অমুক? কেমন আছ? আজ কি হয়েছে বল তো?" ইত্যাদি

খেতে বসতে বসতে রাত্তির পৌনে একটা বাজল। বনি মেথি চিকেন বানিয়েছিল - দারুণ খেতে হয় সেটা - আর মা করেছিল ইলিশ মাছ। খেতে খেতে কথা হচ্ছে মাছের কত দাম কি বৃত্তান্ত..মা বলল ইলিশ মাছ তো আমার পথ্য, ডাক্তার খেতে বলেছে ওমেগা থ্রি আছে বলে, কিন্তু যা দাম - রোজ কি আর খাওয়া যায়? বনি খুব গম্ভীর হয়ে বলল "তাহলে কাল থেকে ওমেগা থ্রি ক্যাপসুল দিয়ে পাঁচ ফোড়নের ঝোল বানিও"।

এঁটো হাতে আড্ডা মারছি, দেড়টা বাজে - মামা এসে পড়ল। হাতে একটা বাটি। পেছনে চিরুনি হাতে মামী।
আমি - একি মামা এখন খাও নি?
মামা (ব্যাজার মুখে) - না আর কি খাব, বিকেলে মামী এমন এক ধামা মুড়ি বাদাম দিয়েছে, পেট ঢাই হয়ে আছে...
মামী (বিস্মিত) - এক ধামা? এইটুকু বাটিতে মুড়ি দিলাম তো, আর তুমিই চাইলে...
আমি (কাজিয়াটা আটকে) বাটিতে কি?
মামা - এটা হোল চিংড়ি মাছ, খেয়ে নে।
আমি - এখন তো মিষ্টি খেয়ে ফেললাম, কাল খাব নাহয়?
মামা - এটাও মিষ্টি, ওনলি গোলমরিচ আর বাতাবিলেবু দেওয়া।
আমি (হাঁ করে) - বাতাবিলেবু?
মামী - দেখ না আমি বলেছিলাম একটা রেসিপি পেয়েছি, অমনি রান্নাঘরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল - আচ্ছা কাল খাস।
মামা - ঠিক হ্যায়, সামনের সপ্তাহে বিরিয়ানি করব নাহয়, আর স্লাইট ভেটকি ফীলে।

আমরা সমবেত কণ্ঠে আনন্দ প্রকাশ করলাম। নানা আড্ডা হাহা হিহি চলল ভোর রাত্তির অব্দি। শুতে যাওয়ার সময় শুনি কাক ডাকছে। আহ! কদ্দিন পর কাকের ডাক! 

নববর্ষের দেড়দিন


তেরই এপ্রিল। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে ধড়মড় করে উঠলাম সাড়ে সাতটার সময় – উঠে দেখি সে সাজসজ্জা করে বাসী কফি খেয়ে কাজে বেরিয়ে গেছে। এদিকে ফোনটা টেবিল বিরাজমান আর আমার চাবির গোছাটা নেই; তার মানে যে গাড়িতে তেল নেই, সেটাই নিয়ে বেরিয়েছে। আবার ফোন ফেলে গেছে, কি অদ্ভুত আক্কেল! এই সব সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে দরজা জানলা খুলে দেখি ফটফটে নীল আকাশ, প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে, বোগেনভিলিয়াতে তিনটে-পাঁচটা ফুল এসেছে। মনটা খুশি হয়ে উঠলো – আজ শুক্কুরবার, কাল পয়লা বৈশাখ!

কফি বসিয়ে চট করে আপিসের ইমেল দেখে আনন্দবাজার পড়তে যাব যাব করছি, এমন সময় আমার ক্লিনিং লেডি এসে উপস্থিত। কি ব্যাপার – আজ তো তার আসার কথা না? এর কথা একটু বলে নি, নাম ফাবিওলা, ধাম কলম্বিয়া। সেখানে উকিল ছিল, তারপর অ্যামেরিকায় এসে ইংরিজি শেখার অনিচ্ছের দরুণ এখন বাড়ি পরিষ্কারের ব্যবসা করে। আমার থেকেও বাতিকগ্রস্ত, আর এতই বাক্যবাগীশ যে ওর ইংরিজি অথবা আমার স্প্যানিশ বলতে না পারায় ওর কিচ্ছু আসে-যায় না ।

তো সে আজ এসেছে কেন? দরজা খুলে আমি হেসেটেসে গুড মর্নিং বললাম,তারপর জিগ্যেস করলাম - "today why come?" ওর সঙ্গে সাধারণতঃ এইভাবে কথোপকথন চালাতে হয়। উত্তরে সে একগঙ্গা কথা বলে গেল, যার মধ্যে থেকে আমি "pero", "como se ise", "columbia" "manana" এই কটা কথা ধরতে পারলাম. কিন্তু গোটা বক্তব্যটা বোঝা গেল না। অগত্যা Google Translate খুললাম কম্পিউটারে (সময়বিশেষে ওর সঙ্গে এভাবেও কথোপকথন চালাতে হয়)। 

অনেক পরিশ্রমের ফলস্বরূপ জানা গেল যে ওরা দশদিনের জন্যে "দেশে" যাচ্ছে তাই আজ আমার বাড়ি পরিষ্কার করতে এসেছে।

ভালই হলো - সংক্রান্তির দিনে "বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক", Vacuum-cleaner এর হাঁড়িচাঁছা শব্দে বাড়ি মুখরিত হলো | ফাবিওলা পাপোশ, ছোট কার্পেট ইত্যাদি সোফার ওপর তুলে রেখে, যত্রতত্র জুতোপায়ে ঘুরে ঘুরে পরিষ্কার করতে লাগলো। আমি শিউরে উঠে কাজে মন দিলাম - যস্মিন্‌ দেশে যদাচার।

ঘন্টাদুয়েক পরের কথা। কাজে মনটা বেশ ডুবে এসেছে, আরেক কাপ কফি আর গোটা পাঁচেক krackjack বিস্কুট শেষ করে এনেছি, এমন সময় +৯১ নম্বর থেকে ফোন। চমকে উঠে ঘড়ি দেখলাম - কলকাতায়ে মাত্র রাত্তির ন'টা, এই অসময়ে ফোন কেন? "হ্যালো, মা? কি ব্যাপার? রেখে দাও, আমি করছি – না, মিটিং নেই , থাকলে ফোন ধরলাম কি করে? দেড় কিলো মাছ রান্না হচ্ছে? বাঃ দারুণ ব্যাপার মা – না, এখানে কাতলা মাছ পাওয়া যায় না, আর কাঁচা আম এখনো দেখি নি.. নতুন জামা? আছে। আমি তোমায় পরে ফোন করছি মা।" সংক্রান্তি উপলক্ষে বাড়িতে আম-মাছ রান্না হচ্ছে; ঝোলটা বেজায় ভালো হয়, এদিকে কাতলা মাছ আমার দু-চোখের বিষ, দেখলেই গা পিত্তি জ্বলে যায়। বেশ একটা হরিষে বিষাদ ব্যাপার।

ফাবিওলা ইতিমধ্যে কাজকর্ম শেষ করে এনেছে, যন্ত্রপাতি গুটিয়ে টাকা নিয়ে আকারে-ইঙ্গিতে জানালো যে ও আমার জন্যে কলম্বিয়ান কফি নিয়ে আসবে, আরো কি একটা আনবে সেটা বুঝতে পারলাম না – হাত দিয়ে চৌকো মত দেখাল – পোস্টকার্ড কিংবা চকোলেট বোধহয়। ওকে দুগ্গা দুগ্গা বলে এগিয়ে দিলাম, পয়লা বৈশাখে যাত্রা, ভালোয় ভালোয় ফিরে আসুক বাবা। ও আমার পরিষ্কারের definition খুব ভালো বোঝে।

দুপুর আসন্ন। কুইজ গ্রুপে খানিক আড্ডা মেরে কি খাওয়া যায় ভাবছি, পিড়িং পিড়িং করে Skype থেকে ডাকাডাকি| মামীর মুখ ভেসে উঠলো অচিরেই, পাশে মামীর মেয়ে। স্রোতের মত কথা ভেসে এলো " পম্পি? কানে ওটা কি লাগিয়েছিস? এমা, তোর মুখটা এমনি কালো কালো লাগছে কেন? চশমা পরেছিস লাল রঙের? আমেরিকাতে লোকে ফর্সা হয় আর মোটা হয়, আচ্ছা তোর এখন বিকেল না রাত?" ইত্যাদি ।
"মামী? এটা হেডফোন। আর আমার মুখে কিছু হয় নি, আলোর উল্টো দিকে আছি তাই, আর ফোন থেকে মুখটা distorted লাগছে। চশমা মোটেই লাল নয়। তুমি মাথায় ফিতে বেঁধেছ কেন?"
"এই তো ফিতেটা ফেলে গেছিলাম গতবার, এখন চুল বাঁধছি।আমরা ঝুমকির কাছে এসেছি, জানিস তো? আচ্ছা তোরা নববর্ষে কি করবি?”
"জানি মামী, ঝুমকিই তো ফোনটা করলো, তুমি ওর কাছে না থাকলে কি করে তোমায় ওর ফোনে দেখছি? নববর্ষ বলে এখানে আলাদা কিছু বুঝছি না। আচ্ছা, Pixi কোথায়?"

বোনপোর আবির্ভাব, কপালে একটা লাল টিপ, মাথায় নানা রঙিন পালক লাগানো একটা মুকুট-জাতীয় কিছু। সে খানিকক্ষণ আমাকে বাঘের পিঠে খাওয়ার গল্প পড়ে শোনালো। তারপর ভিডিও দিয়ে আমার ফ্রিজের ভেতরটা দেখে নানা মন্তব্য করলো "কত্ত কত্ত আপেল! প্রেসার কুকের কই? কুকাম্বার নেই? ভেজিটেবিল?" (আমার ফ্রিজে সত্যি ভেজিটেবল নেই - রান্নার পাট outsource করা আছে এক পাঞ্জাবী মহিলার কাছে) তারপর ঠাকুরের তাক দেখে "সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে" আওড়ে, মুখ দিয়ে বিচিত্র "পুঁপুঁ" শব্দে শাঁখ বাজিয়ে, দুম করে ফোনটা কেটে দিল। অনেক চেষ্টা করেও আর লাইন পেলাম না। অগত্যা ক্ষুন্নিবৃত্তি করে আবার আপিস।

এরপর গতানুগতিক বিকেল সন্ধ্যে রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়ার পর রাতে মাকে মেসেজ করলাম। মা খুব ব্যাস্ত, পিঙ্গু (আমাদের গোল্ডেন রিট্রিভার) নিমপাতাসেদ্ধ জলে চান করছে, চায়ের সসপ্যানে নিমপাতা সেদ্ধ করা হয়েছে তাই চা তেতো, ঠাম্মা সেটা খেতে পারছে না, এদিকে বড়মাসি দক্ষিণেশ্বর গেছে তিনঘণ্টা হয়ে গেছে – এইসব নানা ঘটনা। নতুন বছরের প্রণাম জানিয়ে ফোন রাখলাম।

ঘুমোতে যাবার আগে টুক করে ফেসবুকে একটা উঁকি দিয়ে দেখি, ওমা! সন্তুদাদা বিয়ে করে ফেলেছে – আর ওদের ওখানে তো আজই পয়লা বৈশাখ! কানাডাবাসিনী সুসানকে “ডেট” করছিল শুনেছিলাম, কিন্তু দুম করে বিয়ে? বড়মাসি কলকাতায়, ওদিকে বিয়েটা অস্ট্রেলিয়ায় হয়েছে, পাত্রপাত্রী সবার বেশ হাশিখুশি ছবি উঠেছে – নিশ্চয়ই লুকিয়ে বিয়ে করছে না? যাক, নিশ্চিন্দি, নতুন বছরে নতুন জীবন শুরু। প্রদীপ্তকে খবরটা জানালাম। ও সন্তুদাদা, সুসান, কাউকেই চিনতে পারল না, কিন্তু বলল ভেরি গুড, খুব ভাল খবর, ওদের কনগ্রাচুলেশান্স জানিয়ে দে। চিঙ্কি সাধে আমাকে “mad-net” বলে?

পরের দিন। সকাল থেকে আকাশ কালো করে ঝড়বৃষ্টি আর আমার মন খারাপ – ইসস, কলকাতায় কালবৈশাখী হলে ছোটাছুটি করে আম কুড়োতাম, উড়ন্ত শিমূলতুলো ধরতাম। আর শিলাবৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। এখানে ছাই না শোনা যায় মেঘের গর্জন, না পাওয়া যায় বৃষ্টির গন্ধ, না দেখা যায় হাওয়ায় ওড়া খবরের কাগজ – এইসব গজগজ করছি আর রুপুদির বর্ষার গানের সিডিটা খুঁজছি, এমন সময় “ পিঙ্গি! কি করছিস, কেমন আছিস? আমরা বম্বে চলে যাচ্ছি, জিনিস সব প্যাক হয়ে গেছে, এখন হোটেলে আছি আর কারেন্ট নেই। আমি কাজ করে করে রোগা হয়ে গেলাম।” আটহাজার মাইল নস্যি করে দূরভাষে ভাইয়ের গলা, সঙ্গে বুবুন । খানিক আড্ডা মেরে দেখি বোনের মেসেজ “পয়লা বৈশাখে তোকে একটা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম, প্রদীপ্তদাকে হাফ।” ফোন করলাম, কিন্তু হিজিবিজি কথার ফাঁকে আদ্ধেক প্রণামটা কি ব্যাপার জেনে নেওয়া হলনা।

ওদিকে মা নেমন্তন্ন খেতে গেছে স-পিঙ্গু, ফিরতে দেরি হবে, এদিকে বৃষ্টি ধরে এল – আমাদের বেরোনোর কথা, খানিকদূরের একটা ছোট্ট শহরে যাব। ব্যাগপত্র গুছিয়ে হাইওয়েতে উঠে ফোন করলাম – কলকাতায় রাত্তির সাড়ে এগারোটা, মায়ের সবে সন্ধ্যে।
“আজ যা কাণ্ড হল না? বড়মাসি তো সেই সাতসকালে দক্ষিণেশ্বর গেছে সন্তুর বিয়ের পুজো দিতে একটা লাল সালওয়ার কামিজ পরে।” (আমি জানতাম না বিয়ে)
“সেকি, তোকে বলিনি ওরা পয়লা বৈশাখে বিয়ে করবে ঠিক করল? আমি একদম ভুলে গেছি – ছিঃ ছিঃ, তোকে জানানো উচিত ছিল।“ (ঠিক আছে মা, অত কিছু ছিছি করতে হবে না)
“না না তুই জানতে পারলিনা, এদিকে আমরা সবাই জানি।“ (তাতে কিচ্ছু এসে যায় না)
“তাহলে কাকে বললাম বল্‌তো?” (মা! তুমি থামবে? সারাদিন কি করলে বলো!)
“হ্যাঁ, সে পুজো দিতে গিয়ে সাড়ে তিনঘণ্টা ধরে গঙ্গায় চান করেছে, তারপর এমন টায়ার্ড হয়ে গেছে যে মন্দিরের অফিসে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে অফিসের লোকদের বলেছে, আমি বুড়োমানুষ, আমার হয়ে একটু পূজো দিয়ে আসবে ভাই? আমি স্নান করে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।“ (এটা অবিশ্বাস্য, মা, বড়মাসি ... নাঃ কিছু বলার নেই)
“তারপর এক চ্যাঙ্গারি প্রসাদ নিয়ে বাড়ি এলো বেলা দেড়টা। আমরা দুটো করে মাছ খেলাম। বিকেলে পিঙ্গুকে নতুন বাটি বার করে দিলাম, আমি নতুন শাড়ি পরে বেরোলাম। তোরা কি করছিস? আমি এখন বই পড়ব।“ (কটা বাজে মা? এত রাত্তির করছ কেন?)
“কোথায় রাত্তির? সবে তো পৌনে বারোটা বাজল!” (না, এখন রাত্তির কেন হবে, ঘোর দুপুর, যাও ঘুড়ি ওড়াও তাহলে)
“বোকা-বোকা কথা বলিস না, খামোখা ঘুড়ি ওড়াব কেন? এই তো একটু বইটা পড়ে নি, দেখি মামী যদি ফোন করে!” (মামী এখন ফোন করবে? তোমাদের প্রব্লেমটা কি বল তো?)
“প্যাঁকপ্যাঁক করিস না তো – আমাকে আমার মত থাকতে দাও, ব্যাস্‌!” (হোপলেস, মা। ঠিক আছে, টাটা গুড নাইট।)
“নতুন বছরের অনেক আশীর্বাদ নিস তোরা। শুভ নববর্ষ।”

পয়লা বৈশাখ অবশেষে অস্ট্রেলিয়া হয়ে কলকাতা ছুঁয়ে মায়ামিতে নতুন বছর শুরু করল। ১৪১৯ সালে সবার শুভ হোক্‌।

শুভ নববর্ষ!


(April, 2012)

Kojagori


Lakshmi Puja. Or Lokhhi Pujo, as we Bengalis say. Relatively easy to execute; niyoms are not too stringent, and one does not necessarily need a Purohit to reign over the proceedings. So Lokhhi Pujo it was, this year. My first “independent” pujo, outside of home. And the husband’s craving for luchi/begunbhaja/payesh contributed significantly to his enthusiastic “pujor bajar” drive, fifty kilometers north of Miami.

The plan took shape in tentative steps. What does one do, to begin with? Not being the ritualistic one, frantic phone calls were made to Ma and Mami.
They were super excited. Conversation follows -
“ Ei to, kichhu na, khoob shoja. Eita eita laagbe…“ (list of a dozen different things, and then helpful suggestions for alternatives)
“Ponchoshoshyo ache? Na na pNaachphoron diye hobe na, shudhu chaal diye dish. Daab na pele je kono gota phol ghawte boshiye dish."
"Lal gamch nei? ekta rumal diye ghawt dheke dibi.…notun rumal ache to? Paper napkin hole..nah, paper napkin e hobe na"
"Belpata/tulshipata pawa jachhe na? Ma Lokhhi to shobi janen, bole dish ekhane oshob pawa jay na… na shukno basil leaf dewar dorkar nei”

Probashe niyom nasti.

Jotted down the shopping list and started exploring Indian Grocery stores as far and wide as possible. Chandan – laal and shada – check. Gongajol in a little bottle – check (“Ota Haridwar branded tap water” – helpful commentary from husband) Tamar ghot, prodip, sholte, notun kapor, narkol (“chholar daal hobe bujhi?”) paan, shupuri, korpur – check. Five fruits, five veggies for the fritters, moyda, shuji, mishti – check. Zinc oxide? Not available. Poster color it is then, for the alpona.

Calls to Ma again for process and sequence of pujo, and details on naibidya and bhog. Strange-ish conversation follows -
Ma - ponchoprodip, korpur, dhup, jol-shonkho, phul, pakha ei shob diye aaroti korbi
Ami - jol-shonkho nei. pakha nei. Emni shNaakh e ektu jol diye aaroti kore debo, ar kagoj diye pakha baniye nebo, hnya?
Ma - thik ache, pNachali ache to?
Ami - Chinky boleche ipad e download kore debe.
Ma - thik ache, nibedon kore nish.
Ami - ipad ta nibedon kore debo?
Ma - na na, oi bhog phol prosad ei shobe ektu gongajol chitiye nibedon kore dish.
Ami - achha Ghawte ki jeno ekta aaNkte hoy
Ma - hNya kathi kathi haat pa ola manush - prothome ekta plus aaNk. Tarpor opore ekta golmoto mukh, haat pa gulo extend kore laterally...
Ami - lateral abar ki, bairer dike korbo to?
Ma - lateral medial bujhish na! medial mane towards the midpoint of the body, lateral mane..
Ami - na o shob daktari byapar - pujor modhhye lateral medial hijibiji ..dhutteri. Haat pa gulo tene tene bairer dik kore debo, ei to?
Ma - hNya ar proportion ta thik rakhish mane gola pet haat paa..
Ami - offf Ma!! Achha ami rakhchi ekhon.

Pujo morning. Garland for the “ghot”, strung and preserved in the fridge to avoid wilting.  Gobindobhog chaal soaked for naibidya. Payesh made. Bhog ingredients waiting to be cooked by Chinky, who is flying in this evening. In all this pujo excitement, I almost forget I have meetings and work and suchlike mundane things to do. But the day is relatively light and I am pretty much done by noon, thanks to suspected divine intervention.

Afternoon. I walk in the neighbourhood, looking for a public mango tree. While almost every house has various mango trees in their yards, I am looking for one that a) has some procurable stems within reach b) is relatively less conspicuous. Voila! Returning home with my precious 7-leafed stem, I collect some Kolapata, Jui and Jaba too, from random neighbour's yards. Pujo is a community affair, after all, so no harm done. And I am greatly pleased with meself.

Evening. Furniture moved to accommodate the pujo sprawl, I collect multiple little silver “Lokhhi Thakur” idols and arrange then on a small teapoy. (That word, incidentally, has come from “tepaya” and has nothing to do with tea.) Clay lamps and incense sticks ready to be lit. I put all the "upochaar" in little pieces of "kolapata"- prodip, shNaakh, chandan, shidur, gongajol in a little onyx jar, korpur, ghawt. Try some alpona with poster colour and not satisfied with the finished product, I crush rice in a recently aquired "haman-dista", make a white paste out of it, and paint some more. NOW the alpona comes out better. Yay!

Husband fetches Chinky from airport. General sense of wonder at the transformation of the living room and the "pujo pujo gondho". I feel pretty smug :) Cooking, cutting, frying etc completed, Chinky and I change into saris and start Pujo around 11. Husband graces the occasion by pairing a panjabi with bermudas, and picking from the bhog plate. Reminds me, not oddly, of "Manojder Obbhut Bari".

Purnima. Sitting on the Aashon,  I try to imitate Mami - our facto purut-thakurun - and sprinkle Gongajol on the offerings, then chant all the Mantras I can recall, including invocations for Durga, Shib, Narayan, Kali, Chandi, Saraswati and Lakshmi, of course. I figure since they all belong to one big happy family, Ma Lokhhi wouldn’t mind sharing her pujo the other gods and goddesses. Follow this up with nice stick-figure on copper Ghawt, place mango leaves, coconut and pretty red cloth on top and cover with now-almost-frozen garland. Start with iPad pNachali reading, which goes smoother than I expected. Pnachali reading done, perform Aaroti sans the "pakha", offer pushpanjoli, and that’s it! We are done with Pujo.

I feel strangely lightheaded and realize that I had forgotten to eat anything all day. Which is as it should be.

Dinner follows, along with proshad/bhog eating and soon, the moon has traversed half the sky. Mission well accomplished, we retire happy and exhausted, but not before I've done a quick photo-upload on Facebook and called Ma to report on successful completion of my first Pujo.

And later, in a moment of quiet contemplation, a thought that was hovering at the  back of my mind, defines itself clear and true. I realize that I didn’t do this Pujo for overarching religious reasons, or because I badly wanted to appease Ma Lokhhi. (In fact, I have always felt closed to Ma Saraswati for some inexplicable reason)

So why did I ? For a purely selfish purpose - to make my little Miami home  a part of P544, Raja Basanta Roy Road. To reconnect with memories of childhood, the familiarity of sandalwood, incense, and holy fire. The calming sound of littany and the sonority of conchshells. The soft hues of oil lamps. The stunning contrasts in bright flowers on a green leaf. The smell of ghee-korpur-chandan-agaru. The fulfillment of togetherness. And the indescribable feeling of being whole, again.

And, our "tintolar thakurghor" extended its reach across seven seas to enfold us in its space. Purnamadah Purnamidam.

We were blessed.

(October, 2011)